আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল ইয়াশার প্রথমবারের মতো নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে অল্প ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ, জাতীয় নিরাপত্তা, সরকারের জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা—এসব ইস্যুই এবারের নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটেই ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট।
জরিপে এগিয়ে আইজেনকোটের নতুন দল
ইসরায়েলের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ১২–এর সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে গাদি আইজেনকোটের দল ইয়াশার পেতে পারে ২৩টি আসন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পেতে পারে ২২টি আসন।
জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকেও আইজেনকোট এগিয়ে রয়েছেন। এতে অংশ নেওয়া ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ৬৬ বছর বয়সী গাদি আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। বিপরীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে উপযুক্ত মনে করেছেন ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা।
যদিও এককভাবে কোনো দলই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না, তবু এই জরিপকে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাজনৈতিক উত্থান
গাদি আইজেনকোট ২০২৫ সালে ইয়াশার নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা–ইস্যুতে তাঁর অবস্থান তাঁকে দ্রুত জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত নেতায় পরিণত করেছে।
আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত, জিম্মি সংকট এবং সরকারের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে ব্যাপক বিতর্ক চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা এবার মূল্যায়ন করবেন—২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় নেতানিয়াহু সরকার কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে।
সেনাপ্রধান থেকে রাজনৈতিক নেতা
গাদি আইজেনকোট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান বা চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক নেতৃত্বে থাকার সময় তিনি কঠোর নিরাপত্তানীতির প্রবক্তা হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক কৌশল নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু আলোচনা হয়েছে।
তাঁর অবস্থান অনুযায়ী, ইসরায়েলের ওপর হামলার জবাবে আরও শক্তিশালী ও ব্যাপক সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত।
একই সঙ্গে হামাসের ২০২৩ সালের হামলার পর ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকেও তিনি অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছিলেন।
১০ দফা কর্মসূচি নিয়ে ভোটের মাঠে
গাদি আইজেনকোট তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা ১০ দফা কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা করছেন।
তিনি দাবি করছেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।
তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হলো, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার ঘটনা তদন্তে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন।
আইজেনকোটের মতে, ওই হামলার আগে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ব্যর্থতা ছিল। এসব ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে বড় পার্থক্য
২০২৩ সালের হামলার পর থেকে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে আন্দোলন করেছেন।
তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার স্বাধীন কমিশনের পরিবর্তে এমন একটি তদন্ত কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে কমিশনের সদস্য নির্বাচন করবেন রাজনীতিকেরা।
সমালোচকদের মতে, এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
অন্যদিকে আইজেনকোট বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি কমিশনের মাধ্যমেই হামলার প্রকৃত কারণ এবং দায় নির্ধারণ করা সম্ভব।
নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনী অঙ্গীকারে গাদি আইজেনকোট আরও বলেছেন, তিনি একটি নতুন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তানীতি প্রণয়ন করবেন।
এই নীতির আওতায় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন কৌশল গ্রহণ করা হবে।
এ ছাড়া তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থান এখনো অস্পষ্ট
যদিও অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও নিরাপত্তা ইস্যুতে আইজেনকোটের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, তবে ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে তাঁর অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা এবং কঠোর নিরাপত্তানীতির সমর্থনের কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান নেতানিয়াহুর নীতির সঙ্গে পুরোপুরি ভিন্ন নয়।
নির্বাচনের আগে উত্তপ্ত রাজনৈতিক লড়াই
আগামী অক্টোবরের নির্বাচনকে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে রয়েছেন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট নিজেকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।
জনমত জরিপে তাঁর দল এগিয়ে থাকলেও ইসরায়েলের জোটভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন নির্ভর করবে নির্বাচনের ফল, ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং পরবর্তী জোট সমীকরণের ওপর। ফলে আগামী কয়েক মাসে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হওয়ার আভাস মিলছে।