ঢাকা

ইরান যুদ্ধের হতাহতের তথ্য নিয়ে নতুন বিতর্ক, পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে পরিবর্তন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর অভিযোগের মধ্যেই তথ্য প্রকাশের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন। নতুন এই পদ্ধতিতে ৭ জুলাইয়ের পর সংঘটিত হতাহতের তথ্য আর ইরান যুদ্ধের মূল পরিসংখ্যানে রাখা হচ্ছে না। ফলে যুদ্ধে মোট কতজন মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন, তা জানতে এখন দুটি আলাদা তথ্যভান্ডারের হিসাব একত্র করতে হচ্ছে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমালোচনার মুখে রোববার পেন্টাগন তাদের ওয়েবসাইটে তথ্য উপস্থাপনের ধরন পরিবর্তন করেছে। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছে, চলতি মাসে আহত মার্কিন সেনাসদস্যের প্রকৃত সংখ্যা আগে প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

নতুন পদ্ধতিতে আলাদা করা হলো হতাহতের তথ্য

পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কার্যকর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায় এবং সংঘাত আবারও তীব্র আকার ধারণ করে।

এর পর থেকে সংঘটিত হতাহতের তথ্য আর ইরান যুদ্ধের মূল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। পরিবর্তে সেগুলো ‘বিদেশে পরিচালিত সামরিক অভিযানে হতাহত’ শিরোনামে একটি পৃথক ওয়েবপেজে প্রকাশ করা হচ্ছে।

এতে যুদ্ধের সামগ্রিক হতাহতের সংখ্যা বুঝতে ব্যবহারকারীদের এখন দুটি আলাদা ওয়েবপেজের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এতে প্রকৃত হতাহতের চিত্র সাধারণ মানুষের কাছে কম স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

নিহত চার সেনার তথ্য আবার যুক্ত

নতুন ব্যবস্থার আওতায় পেন্টাগনের ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম (ডিসিএএস)-এ সম্প্রতি নিহত চার মার্কিন সেনাসদস্যের তথ্য আবার যুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে ওই চার সেনার মৃত্যুর তথ্য ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তবে এবারও তাঁদের তথ্য মূল ইরান যুদ্ধের তালিকায় নয়, বরং নতুন আলাদা বিভাগে প্রকাশ করা হয়েছে।

কেন এ পরিবর্তন করা হয়েছে, সে বিষয়ে পেন্টাগন কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি।

আহত সেনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬২৪

সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাইয়ের পর আহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা ২০৭ জন, যা আগের প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় ১৪২ জন বেশি।

অন্যদিকে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আহত মার্কিন সেনাসদস্যের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২৪ জনে।

পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা ১৮ জন।

আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের অসঙ্গতি

গত সপ্তাহে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল দাবি করেছিলেন, ৭ জুলাইয়ের পর আহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা ১০০ জনেরও কম।

তবে নতুন প্রকাশিত তথ্য সেই বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি ইরানের বিভিন্ন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে কতজন সেনা আহত হয়েছেন, সে সম্পর্কেও দীর্ঘ সময় কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি পেন্টাগন।

তখন শন পারনেল এক বিবৃতিতে তথ্য গোপনের অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মনগড়া’ বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য ছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে তিন মার্কিন সেনার নিহত হওয়ার পর জনগণকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলতেই এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেল পেন্টাগন

রোববার নতুন হতাহতের সংখ্যা এবং তথ্য প্রকাশের পরিবর্তিত পদ্ধতি নিয়ে জানতে চাইলে পেন্টাগনের এক মুখপাত্র সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

আগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর অভিযোগ

গত সপ্তাহে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, পেন্টাগন ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা ১৮ থেকে কমিয়ে ১৪ দেখিয়েছে।

এই তথ্য প্রকাশের পর সাবেক সেনাসদস্য, সামরিক পরিবারের সদস্য এবং কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পত্রিকাটিকে জানান, সম্প্রতি জর্ডান ও ইরাকে চার মার্কিন সেনা নিহত হন। কিন্তু এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এসব মৃত্যু ঘটায় পেন্টাগন সেগুলো মূল ইরান যুদ্ধের পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করেনি।

‘তথ্যগত ত্রুটি’ বলেছিল পেন্টাগন

পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত প্রেস সেক্রেটারি জোয়েল ভালদেজ গত বৃহস্পতিবার বলেন, ওয়েবসাইটে নিহত সেনাসংখ্যা পরিবর্তনের বিষয়টি একটি ‘অস্থায়ী তথ্যগত ত্রুটি’ ছিল এবং দ্রুত তা সংশোধন করা হবে।

তবে শনিবার সকাল পর্যন্তও পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে নিহত সেনার সংখ্যা ১৪-ই দেখানো হচ্ছিল।

এরপর রোববার ওয়েবসাইটে নতুন বিভাগ যুক্ত করে অতিরিক্ত চার সেনার মৃত্যুর তথ্য ‘৭ জুলাই, ২০২৬ থেকে বিদেশে পরিচালিত সামরিক অভিযানে হতাহত’ শিরোনামে আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়।

কংগ্রেসের চাপ বাড়ছে

হতাহতের তথ্য প্রকাশ নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকায় ডেমোক্র্যাট দলের একদল সিনেটর গত বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে চিঠি পাঠান।

চিঠিতে তাঁরা যুদ্ধে নিহত ও আহত মার্কিন সেনাদের সংখ্যা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ, বিস্তারিত এবং সময়োপযোগী তথ্য প্রকাশের দাবি জানান।

সিনেটররা বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য জানার অধিকার মার্কিন জনগণ, কংগ্রেস, সেনাসদস্য এবং তাঁদের পরিবারের রয়েছে।

তাঁদের অভিযোগ, প্রতিরক্ষা দপ্তর সংঘাত চলাকালে হতাহতের তথ্য সময়মতো এবং সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেনি।

যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে ট্রাম্পের ওপর নতুন চাপ

এদিকে, ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের বেশি সময় সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারেন না।

এই প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ দ্বিতীয়বারের মতো একটি প্রস্তাব পাস করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে অথবা তা অব্যাহত রাখতে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়ার আহ্বান জানায়।

বিশ্লেষকদের মতে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ নিয়ে বিতর্ক, তথ্য গোপনের অভিযোগ এবং কংগ্রেসের ক্রমবর্ধমান চাপ—সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স