জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেছেন, বিএনপি বিভিন্ন সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—সবখানেই দলীয়করণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
রোববার (২৬ জুলাই) বিকেলে ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে এনসিপির আয়োজিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ শেষে অনুষ্ঠিত পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘নির্বাচন কমিশনে দলীয় লোক দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়’
আখতার হোসেন বলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যেই বিএনপি নির্বাচন কমিশনে নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসিয়েছে। তাঁর ভাষায়, নির্বাচন কমিশন এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি এখন থেকেই ভবিষ্যতে ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দলীয় ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রশাসনকে একটি রাজনৈতিক দলের অধীনস্থ বা ‘দলদাসে’ পরিণত করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘বিএনপি আওয়ামী লীগের পথেই হাঁটছে’
আখতার হোসেন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষ যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, বিএনপির কর্মকাণ্ড সেই প্রত্যাশাকে ক্ষুণ্ন করছে।
তিনি বলেন, জনগণ এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের অনুসৃত পথেই এগোচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এনসিপির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রত্যাশা পূরণের কথা উল্লেখ করেন।
বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ
পথসভায় বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নারীশক্তির মুখ্য সংগঠক মাহমুদা মিতু। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি এখনো ছাত্রদল ও যুবদলের নামে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ যদি মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের নেতৃত্বে রাজনীতি দেখতে না চায়, তাহলে তরুণদের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে হবে এবং জুলাইয়ের চেতনায় গঠিত এনসিপির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।
মাহমুদা মিতু তাঁর বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানেরও সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া একসময় দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বর্তমান সংবিধান পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই অবস্থান বাস্তবায়নে বিএনপি নেতৃত্ব কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরও যাঁরা বক্তব্য দেন
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির—
যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা,
যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ,
খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুল হক,
ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদ আহসান,
ঝিনাইদহ জেলা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী আরেফিন কায়সার,
এবং নাসির আল সামী।
পদযাত্রা ও অন্যান্য কর্মসূচি
এর আগে ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর থেকে এনসিপির নেতাকর্মীরা একটি পদযাত্রা বের করেন। পদযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পায়রা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত পথসভায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ রাকিবের মা-বাবা এবং শহীদ সাব্বিরের বাবাও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শিশুদের অংশগ্রহণে জুলাই স্মরণে একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এনসিপি।
পথসভায় বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আদর্শ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে দলীয় কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।