বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় শহরের তালিকায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপানের টোকিও। ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কোয়াককুয়েরেলি সাইমন্ডস (কিউএস) প্রকাশিত ‘বেস্ট স্টুডেন্ট সিটিজ ২০২৭’ র্যাঙ্কিংয়ে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এবারের তালিকায় বিশ্বের ১৫০টি শহর স্থান পেয়েছে। শীর্ষ ১০-এ ইউরোপের ছয়টি শহর থাকলেও প্রথম দুটি অবস্থান দখল করেছে এশিয়ার দুই প্রধান নগরী। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, কর্মসংস্থানের সুযোগ, নিরাপত্তা, আধুনিক অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ—এসব কারণেই সিউল ও টোকিও অন্য শহরগুলোকে পেছনে ফেলেছে।
যেভাবে করা হয়েছে মূল্যায়ন
কিউএসের র্যাঙ্কিংয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে কোনো শহরের জনসংখ্যা কমপক্ষে আড়াই লাখ হতে হয়। পাশাপাশি শহরটিতে কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে অন্তর্ভুক্ত অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকতে হয়।
ছয়টি সূচকের ভিত্তিতে শহরগুলোর মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো—
বিশ্ববিদ্যালয়ের মান (University Rankings)
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি (Student Mix)
বসবাসের উপযোগিতা (Desirability)
চাকরির সুযোগ (Employer Activity)
ব্যয়-সাশ্রয়িতা (Affordability)
শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা (Student View)
এই সূচকগুলোর সমন্বিত ফলাফলের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত র্যাঙ্কিং নির্ধারণ করা হয়েছে।
কেন আবারও শীর্ষে সিউল
সিউল বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সূচকে পূর্ণ ১০০ নম্বর এবং চাকরির সুযোগ সূচকে ৯৪ দশমিক ১ নম্বর পেয়েছে। শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত জরিপে শহরটির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, নিরাপদ পরিবেশ, আধুনিক অবকাঠামো এবং উন্নত জীবনযাত্রার প্রশংসা করা হয়েছে।
কিউএসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সিউল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র। বিশেষ করে গ্যাংনাম ও ডিজিটাল মিডিয়া সিটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্র। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং চাকরির সুযোগও সহজে পাচ্ছেন।
টোকিওর শক্তি কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা
র্যাঙ্কিংয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা টোকিও চাকরির সুযোগ সূচকে পূর্ণ ১০০ নম্বর অর্জন করেছে। এছাড়া বসবাসের উপযোগিতা সূচকে পেয়েছে ৯৪ নম্বর।
এই সূচকে শহরের নিরাপত্তা, দূষণের মাত্রা, জীবনযাত্রার মান এবং শিক্ষার্থীদের সেখানে পড়তে আগ্রহের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়েছে।
কিউএসের মতে, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ, সময়নিষ্ঠ ও উন্নত গণপরিবহনব্যবস্থা এবং উচ্চমানের নগরসেবা টোকিওকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।
এ ছাড়া বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ ব্যাংক, বিমা কোম্পানি এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর টোকিওতে অবস্থিত হওয়ায় সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও তুলনামূলক বেশি।
এগিয়েছে এশিয়ার আরও কয়েকটি শহর
এবারের র্যাঙ্কিংয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি শহরের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে।
চীনের বেইজিং ১৯ ধাপ এগিয়ে উঠে এসেছে ১২তম স্থানে। এছাড়া মেলবোর্ন, সিডনি, তাইপেই, সিঙ্গাপুর এবং কুয়ালালামপুরও আগের তুলনায় ১ থেকে ১১ ধাপ পর্যন্ত এগিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণে নতুন উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ এসব শহরের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
ইউরোপের বড় চ্যালেঞ্জ জীবনযাত্রার ব্যয়
র্যাঙ্কিংয়ে ইউরোপের শহরগুলোর উপস্থিতি এখনো শক্তিশালী। এই অঞ্চলের মধ্যে লন্ডন রয়েছে তৃতীয় স্থানে এবং মিউনিখ যৌথভাবে পঞ্চম অবস্থানে।
তবে ইউরোপের কয়েকটি শহরের অবস্থান আগের বছরের তুলনায় কিছুটা পিছিয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়কে উল্লেখ করেছে কিউএস।
উত্তর আমেরিকায় শীর্ষ ২০-এ শুধু বোস্টন
এবারের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র শহর হিসেবে বোস্টন শীর্ষ ২০-এ জায়গা পেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, গবেষণার সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকার শহরগুলো এখনো শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও আবাসন, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং শিক্ষাব্যয়ের উচ্চ খরচ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এশিয়ার আকর্ষণ আরও বাড়ছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে এশিয়ার জনপ্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, দ্রুত সম্প্রসারিত প্রযুক্তি খাত, নিরাপদ নগরজীবন, উন্নত গণপরিবহন এবং বিস্তৃত কর্মসংস্থানের সুযোগ সিউল ও টোকিওকে শুধু উচ্চশিক্ষার নয়, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রেও অন্যতম সেরা গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কিউএসের সর্বশেষ র্যাঙ্কিং সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।