জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে ইউনিসেফের সঙ্গে চলমান সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল একাডেমি প্রতিষ্ঠা, স্কিল-বেজড কোর্স চালু ও উন্নয়ন, আইসিটি ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, কারিকুলাম উন্নয়ন এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার সম্ভাব্যতা যাচাইসহ বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে উপাচার্যের দপ্তরের কনফারেন্স হলে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিসেফের গ্লোবাল টিমের প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ। ইউনিসেফের সাত সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের জেনারেশন আনলিমিটেডের সিনিয়র উপদেষ্টা থমাস মাইকেল কে। সভায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক নাজমুল হোসাইন উপস্থিত ছিলেন। অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান।
ইউনিসেফের প্রতিনিধিদলের মধ্যে আরও ছিলেন প্রধান কার্যালয়ের জেনারেশন আনলিমিটেডের শিক্ষা প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ আপো কুসেলা, পিটুই গ্লোবাল সমন্বয়ক আইরিস মে এলেন ক্যালোগ, প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট ফাহমিদা শবনাম এবং ইস্তানুল কবির।
দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব
সভায় ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ: জার্নি, অ্যাচিভমেন্ট অ্যান্ড রোডম্যাপ টু ২০৩০’-এর আওতায় পরিচালিত ‘ট্রান্সফর্মিং হায়ার এডুকেশন ফর আ স্কিলড, ডিজিটাল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও তরুণ গ্র্যাজুয়েটকে কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তোলার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে মতবিনিময় করেন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা। পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয় কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল একাডেমি প্রতিষ্ঠা ও কোর্স উন্নয়নের পাশাপাশি স্কিল-বেজড কোর্সের পরিধি বাড়ানো, আইসিটি ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে শিক্ষাদান পদ্ধতির আধুনিকায়ন এবং কারিকুলামকে সময়োপযোগী করার বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা ও ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
দুই পক্ষের আলোচনায় দক্ষ, কর্মমুখী, ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে চলমান সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতে যৌথ কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবছর ৭০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
সভায় উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর দেশের ফরমাল ও ইনফরমাল সেক্টরের জন্য প্রায় ৭০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শুধু একাডেমিক ডিগ্রি নয়, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও কর্মমুখী সক্ষমতা দিয়ে গড়ে তোলার বিষয়টি জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে ইউনিসেফ বাংলাদেশ যে সহযোগিতা করছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছে।
উপাচার্য জানান, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আইসিটি ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির কাজে দেশের অভিজ্ঞ ও দক্ষ বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এই উদ্যোগকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করতে ইউনিসেফ বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী গ্র্যাজুয়েট তৈরির লক্ষ্য
অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে এমন দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা, যাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতার চাহিদা দেশীয় শ্রমবাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও থাকবে।
তিনি বলেন, “আমাদের দক্ষ গ্র্যাজুয়েট প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের ডিগ্রিধারীদের দক্ষতা ও যোগ্যতার ব্যাপক চাহিদা তৈরি করতে আমরা কাজ করছি।”
এ লক্ষ্যে ইউনিসেফ বাংলাদেশকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লিড পার্টনার’ হিসেবে পাশে পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন উপাচার্য। তাঁর মতে, বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীকে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় কর্মদক্ষতা ও বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান দিয়ে প্রস্তুত করা গেলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন আরও কার্যকর হবে।
সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস ইউনিসেফের
ইউনিসেফের জেনারেশন আনলিমিটেডের সিনিয়র উপদেষ্টা থমাস মাইকেল কে বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশাল প্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এই তরুণদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইউনিসেফ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইউনিসেফের অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
থমাস মাইকেল কে আরও বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার টারশিয়ারি স্তরে কাজ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হচ্ছে, তার ভিত্তিতে একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা সম্ভব হলে তা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষায় নতুন উদ্যোগ
সভায় আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল উচ্চশিক্ষায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল কনটেন্ট, আধুনিক কারিকুলাম এবং দক্ষতাভিত্তিক কোর্সের বিস্তার শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে পারে বলে সভায় মত দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মূল একাডেমিক ডিগ্রির পাশাপাশি নির্দিষ্ট দক্ষতার ওপর স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও সনদ অর্জনের সুযোগ পেতে পারেন। এর ফলে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতার সামঞ্জস্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে ডিজিটাল দক্ষতা, আইসিটি, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির সমন্বয় করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করার বিষয়ে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিরা
রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেনের সঞ্চালনায় সভায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক বিভাগের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
সভায় বক্তব্য দেন স্নাতকোত্তর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ফকির রফিকুল আলম, কারিকুলাম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন কেন্দ্রের ডিন (ভারপ্রাপ্ত) এ এইচ এম রুহুল কুদ্দুস, ইনস্টিটিউট অব ফরেনসিক সায়েন্সের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ বিন কাশেম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ দপ্তরের পরিচালক সালমা পারভীন, ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস স্টাডিজের চেয়ারম্যান মো. মুজাহিদুল ইসলাম এবং আইসিটি (কারিকুলাম)-এর ফোকাল পারসন সহযোগী অধ্যাপক নাজমা তারা।
সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে চলমান বিভিন্ন উদ্যোগ, কারিকুলাম আধুনিকায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
আলোচনা শেষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের মধ্যে চলমান অংশীদারত্বকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি দক্ষ, কর্মমুখী, ডিজিটাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশালসংখ্যক তরুণকে আধুনিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার এই উদ্যোগকে ২০৩০ সালের রোডম্যাপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করা হয়।