ঢাকা

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের দাবি, ইরান বলছে শর্ত পূরণ না হলে বন্ধই থাকবে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চলার মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর মার্কিন বাহিনীর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ইরানকে তিনি বিশ্বাস করেন না এবং দেশটি অতীতে যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার মিথ্যা বলেছে।

মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের প্রিন্স জর্জেস কাউন্টির সামরিক ঘাঁটি জয়েন্ট বেজ অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে একদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির দাবি, অন্যদিকে তেহরানের প্রতি গভীর অবিশ্বাস—দুই ধরনের বার্তাই উঠে এসেছে।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে ‘সবকিছু ভালোভাবেই’ এগোচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এবং সেখানে ইরানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

হরমুজে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের’ দাবি ট্রাম্পের

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে; অন্য কারও হাতে নয়, শুধু আমাদের।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশের নৌবাহিনীর সক্ষমতার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দেশটির জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতি ভালো দিকে এগোচ্ছে।

তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আশাবাদী বক্তব্য দেওয়ার পরই তিনি তেহরানের প্রতি নিজের অবিশ্বাসের কথা স্পষ্ট করেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ইরানকে বিশ্বাস করি না। ইরানকে বিশ্বাস করবে, এমন সর্বশেষ ব্যক্তি হব আমি। তারা আমাকে বারবার মিথ্যা বলেছে।’

অর্থাৎ আলোচনায় অগ্রগতির দাবি করলেও ইরানের প্রতিশ্রুতির ওপর তাঁর আস্থা নেই—ট্রাম্পের বক্তব্যে এমন একটি অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের দিকে জ্বালানি পরিবহনের প্রধান সমুদ্রপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সরু জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী কোনো বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।

এ কারণে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

প্রণালিটির দুই পাশে রয়েছে ইরান ও ওমান। এই ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে হরমুজে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুই দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছে।

দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও যোগাযোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ চলছে। মার্কিন এক সূত্রের বরাত দিয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানা গেছে।

সম্ভাব্য কোনো সমঝোতা হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও কমে আসতে পারে।

তবে এখনো পর্যন্ত এমন কোনো চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, যার মাধ্যমে প্রণালিটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

আলোচনায় ওমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান আলোচনায় ওমান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।

ভৌগোলিকভাবে ওমান প্রণালিটির বিপরীত পাশে অবস্থিত। ফলে ইরান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের মধ্যকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশটির বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে উত্তেজনার সময় অতীতেও ওমান বিভিন্ন ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ খুঁজতে মাসকাটের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কীভাবে হরমুজে সংকট তৈরি হলো

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বর্তমান সংকটের সূত্রপাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর সামরিক হামলার পর।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়।

এর ফলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হলে পরিস্থিতিতে সাময়িক উন্নতি দেখা দেয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই দুই পক্ষ আবার পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ে।

এরপর ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়।

ফলে বিশ্ববাজারে আবারও তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

চুক্তি হলে খুলতে পারে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ

বর্তমান আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি কবে স্বাভাবিক হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো কার্যকর সমঝোতা হলে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় স্বস্তি ফিরতে পারে।

তবে প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক বিরোধ পুরোপুরি মিটিয়ে ফেলা সহজ হবে না। কারণ, হরমুজকে কেন্দ্র করে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও জড়িত।

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার—সবগুলো বিষয় একই সঙ্গে এই সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তেলের বাজারে ফের অস্থিরতা

হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও।

আজ বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ৭২ সেন্ট বা ০ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৯ দশমিক ৬৩ ডলারে উঠেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৭১ সেন্ট বা ০ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৩ দশমিক ৯১ ডলারে পৌঁছেছে।

বাজারের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে দ্বৈত বার্তা

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে দুটি পরস্পরবিরোধী বার্তা স্পষ্ট।

একদিকে তিনি বলছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘দারুণভাবে’ এগোচ্ছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে তিনি একই সঙ্গে বলছেন, ইরানকে তিনি বিশ্বাস করেন না এবং হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

এ ধরনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন একদিকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সামরিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলে তেহরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইছে।

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ফলাফল এবং ওমানের মধ্যস্থতার ওপর।

যদি দুই পক্ষ একটি কার্যকর ও টেকসই সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি তেলের বাজারেও চাপ কমতে পারে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হয়ে সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়লে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফলে ট্রাম্পের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের’ দাবি সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ভবিষ্যৎ এখনো কূটনৈতিক সমঝোতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের গতিপথের ওপরই নির্ভর করছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স