রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশাপাশি বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবেও আনুষ্ঠানিকভাবে অলি আহমদের প্রার্থিতা সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে অলি আহমদের পক্ষে ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সিইসির কাছে অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ সময় ১১-দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি কয়েকজন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
অলি আহমদের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হিসেবে সই করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। আর সমর্থক হিসেবে সই করেছেন এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন।
বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী অলি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে ১১-দলীয় ঐক্য জোট ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিপরীতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন এই জোটে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদের মনোনয়ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অলি আহমদ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা এবং এলডিপির চেয়ারম্যান। তাঁকে প্রার্থী করার বিষয়ে জোটের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন ঘটেছে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় জোটের নেতাদের উপস্থিতি এ প্রার্থিতার প্রতি ১১-দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সমর্থনও তুলে ধরে।
মির্জা ফখরুলের পর অলি আহমদের মনোনয়ন
এর আগে বৃহস্পতিবার বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। ফলে একই দিনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে অলি আহমদ—দুই প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেওয়ায় এখন মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র স্পষ্ট হবে।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের বিধান থাকায় সংসদে দলগুলোর আসনসংখ্যা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সরাসরি জনগণের ভোটে অনুষ্ঠিত হয় না। সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে তাঁদের প্রকাশ্য ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের জন্য ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। একাধিক প্রার্থী চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলে ওই দিন সংসদকক্ষেই ভোট গ্রহণ করা হবে।
সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী সাধারণত নির্বাচনে এগিয়ে থাকেন। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করতে হয়।
মনোনয়নপত্র বাছাই ১৬ আগস্ট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অলি আহমদের পক্ষে তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
এর পরের ধাপে ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে। বাছাইয়ের সময় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক ও সমর্থকের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক শর্ত যাচাই করা হবে।
বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর ১৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী কারা থাকছেন, তা নিশ্চিত হবে।
২০ আগস্ট সংসদে ভোট
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট। ভোট গ্রহণের জন্য ওই দিন জাতীয় সংসদের বৈঠকও ডাকা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে। ভোটার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। তাঁরা প্রকাশ্য ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবেন।
ফলে ২০ আগস্টের ভোটকে কেন্দ্র করে এখন মূল নজর থাকবে মনোনয়নপত্র বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকার দিকে।
বিরোধী জোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য
অলি আহমদের মনোনয়ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রকাশ ঘটিয়েছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য তাদের পক্ষ থেকে একজন প্রার্থী দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের বার্তা দিয়েছে।
মনোনয়নপত্রে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের প্রস্তাবক হিসেবে স্বাক্ষর এবং এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিনের সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর জোটের বিভিন্ন দলের সমন্বিত অবস্থানকে তুলে ধরেছে।
এখন ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র পরিষ্কার হবে। একাধিক প্রার্থী ভোটের মাঠে থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট।