দেশে তীব্র বিদ্যুৎসংকট ও লোডশেডিং পরিস্থিতির সমালোচনা করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দেশে লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি অতীতের সংকটময় সময়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি গ্রাহকদের ভুতুড়ে বিলেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কে আয়োজিত এক গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের দাবিতে’ এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা এই সমাবেশের আয়োজন করে।
‘২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ঘটনা আমরা জানি’
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে মানুষের কাছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল আসছে। তাঁর দাবি, বিএনপি সরকার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে দেশের লোডশেডিংয়ের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ঘটনা আমরা জানি। লোডশেডিং কীভাবে হয়েছিল, কীভাবে খাম্বা ছিল, কিন্তু বিদ্যুৎ ছিল না—একই রকম দেশ আমরা আবারও দেখতে পাচ্ছি।’
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বিএনপির আগের সরকার আমলের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারের সময়েও বিদ্যুৎ সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পড়ছে।
জ্বালানিসংকটের জন্য সরকারকে দায়ী করলেন
দেশে চলমান জ্বালানিসংকটের জন্য সরকারের পরিকল্পনার ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা, লুটপাট ও দুর্নীতিকে দায়ী করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমান দেশে ফেরার সময় ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ বলেছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ থেকে ছয় মাসে সেই পরিকল্পনার বাস্তব ফলাফল দেশের মানুষ দেখতে পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, বিএনপি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বেড়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কমিটি গঠন এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে অনিয়ম ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে।
তেল-গ্যাসসহ নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা
সরকারের অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পনার কারণে তেল, গ্যাস, চাল ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।
তাঁর প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে রয়েছে, তখন সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যে কেন দেশের পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ও সংকটমুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক মিথ্যাচার করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগের একটি বড় অংশ গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে ঘিরে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় সরকার জনগণকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু গণভোটে বিপুলসংখ্যক মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পরও সরকার ক্ষমতায় গিয়ে সেই রায় বাস্তবায়ন করেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নাহিদ ইসলামের দাবি, সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠনের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। এ কারণে তিনি বর্তমান সরকারকে ‘প্রতারক ও বিশ্বাসঘাতক সরকার’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বেসরকারি কোম্পানির হাতে জ্বালানি খাত তুলে দেওয়ার অভিযোগ
দেশে যখন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির সংকট চলছে, তখন একটি বেসরকারি কোম্পানির হাতে দেশের তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণ ও আমদানির দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।
তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে সরকার জনগণের স্বার্থের বদলে বড় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছে।
তিনি বলেন, যাঁদের অর্থের সহায়তায় বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, এখন তাঁদের হাতেই দেশের সম্পদ তুলে দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে সরকার আর সাধারণ মানুষের সরকার হিসেবে কাজ করছে না; বরং বড় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষাকারী সরকারে পরিণত হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড নিয়েও বিএনপিকে আক্রমণ
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়েও সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) ওপর ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা হামলা বা চাপ সৃষ্টি করছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সরকারি সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীদের বদলে বিএনপির নেতা-কর্মী বা তাদের প্রভাবাধীন ব্যক্তিরা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এ পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে জনগণ সরকারকে ‘লাল কার্ড’ দেখিয়ে দেবে।
‘এই সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না’
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানিসংকটের কারণে শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকার যদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটসহ বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে না পারে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে, তাহলে তাঁদের ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণ সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে দুর্নীতি ও লুটপাট করার জন্য নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি করাই সরকারের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় থেকে মন্ত্রীদের সন্তানদের লুটপাট, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে টেন্ডারবাজি বা দুর্নীতির সুযোগ দেওয়া হলে জনগণ সরকারকে ক্ষমতায় রাখবে না।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন
সমাবেশে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাঁর দাবি, দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার ওপর আঘাত এলেও বর্তমান সরকার শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যথাযথভাবে সুরক্ষিত থাকছে না। বিএনপি জাতীয়তাবাদের কথা বললেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে পারেনি বলেও তিনি সমালোচনা করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারত সরকারের সঙ্গে বিএনপি আপস করলে বা তারেক রহমান ভারত সফর করলে জনগণের মধ্যে বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে।
তাঁর বক্তব্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্ব সেই জাতীয়তাবাদী ধারার প্রকৃত উত্তরাধিকার বহন করছে কি না।
সমাবেশে এনসিপির নেতারা
এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসহাক সরকারের সভাপতিত্বে আয়োজিত সমাবেশে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বক্তব্য দেন।
সমাবেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক রাজনৈতিক চাপ তৈরির অংশ হিসেবে এই সমাবেশ আয়োজন করা হয়। এতে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকটি বিষয়ই উঠে আসে।