ঢাকা

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ১১ জনের মৃত্যু, নিহতদের মধ্যে শিশু

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রয়টার্স ও এএফপি

দক্ষিণ লেবাননে কয়েক দফা ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুই নারী ও তিন শিশুসহ অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। শনিবারের এসব হামলায় আরও ১৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হামলার পর ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর লেবাননে এটিকে অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শনিবারের হামলাগুলো শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না; লেবাননের সরকারি বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় চালানো এসব হামলার মধ্যে কয়েকটি ছিল গত দুই মাসের মধ্যে দেশটির ভূখণ্ডের সবচেয়ে গভীরে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আনসার গ্রামে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের হামলায় সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছেন। একই দিনে দেইর আল-জাহরানি গ্রামে চালানো পৃথক বিমান হামলায় আরও চারজন নিহত হন।

ইসরায়েল বলছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো। তবে লেবানন সরকার দাবি করেছে, হামলায় নিহত বেসামরিক ব্যক্তিরা কোনো সামরিক স্থাপনায় ছিলেন না।

আনসারে ‘হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে’ হামলার দাবি ইসরায়েলের

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আনসার গ্রামে হিজবুল্লাহর অভিজাত রাদওয়ান বাহিনীর একটি ‘কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরে’ হামলা চালানো হয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, হামলায় রাদওয়ান বাহিনীর একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার আলী সামির আল-হাজ হাসান নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল বলছে, ওই ব্যক্তি হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, হামলার সময় হাসানের পরিবারের সদস্যরাও ওই স্থাপনার ভেতরে ছিলেন। তবে তাঁদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি বলে দাবি করেছে ইসরায়েল।

অন্যদিকে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম ইসরায়েলের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, আনসার গ্রামের বাড়িটিতে নিহত ব্যক্তিরা কোনো সামরিক স্থাপনায় ছিলেন না। সেখানে নিহত নারী ও শিশুরাও কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না।

ফলে হামলার লক্ষ্য ও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি হয়েছে।

‘উপযুক্ত জবাব’ দেওয়ার হুমকি হিজবুল্লাহর

হামলার পর হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলার ‘উপযুক্ত জবাব’ দেওয়া হবে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে হিজবুল্লাহ। অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, যুদ্ধবিরতির পরও হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে।

শনিবারের হামলার পর এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আরও তীব্র হয়েছে।

হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে হামলার জবাব দেওয়ার ঘোষণা নতুন করে সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি কাঠামো এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া এবং দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

ইসরায়েল: হামলা আলোচনা থামাবে না

হামলার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান এএফপিকে বলেছেন, হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলা চলমান আলোচনা পিছিয়ে দেবে না।

বরং তাঁর দাবি, এই ধরনের পদক্ষেপ আলোচনা নতুন করে শুরু করতে এবং আরও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে।

স্পিলম্যানের বক্তব্য, ইসরায়েলের কাছে তাদের ‘শত্রু’ কে, তা স্পষ্ট—আর সেটি হলো হিজবুল্লাহ। তাঁর মতে, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলায় ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ আলোচনার পথে বাধা নয়; বরং সেটিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি উপায়।

তবে লেবাননের পক্ষ থেকে এই অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন শনিবারের হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি ‘স্পষ্ট বার্তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো—যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরায়েল যদি নিয়মিতভাবে লেবাননের ভূখণ্ডে হামলা চালায় এবং হিজবুল্লাহ তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়, তাহলে যুদ্ধবিরতি কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তৈরি হওয়া কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি ও অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে না বলে জানিয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই শর্তকে কার্যত ‘আত্মসমর্পণের’ শামিল হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ফলে যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দক্ষিণ লেবাননের নিয়ন্ত্রণ, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মধ্যে কীভাবে সমঝোতা হবে।

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি উপস্থিতি

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল বলছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন ঠেকাতে এসব অভিযান প্রয়োজন।

অন্যদিকে লেবানন সরকার মনে করে, এসব হামলা দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

শনিবারের হামলার ব্যাপ্তি এই বিরোধকে আরও জটিল করে তুলেছে। এনএনএর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন স্থানে একাধিক বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এর কয়েকটি ছিল সাম্প্রতিক দুই মাসের মধ্যে লেবাননের ভূখণ্ডের সবচেয়ে গভীরে চালানো হামলা।

ফলে এটি শুধু একটি সীমান্তবর্তী পাল্টাপাল্টি হামলা নয়, বরং যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী নতুন সামরিক সমীকরণের ইঙ্গিত কি না—সেই প্রশ্নও উঠেছে।

১১ জন নিহতের ঘটনায় বেসামরিক হতাহতের প্রশ্ন

আনসার গ্রামের হামলায় নারী ও শিশুসহ সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনায় বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সরাসরি বলেছেন, নিহত ব্যক্তিরা কোনো সামরিক স্থাপনায় ছিলেন না। ইসরায়েল অবশ্য বলছে, হামলার লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহর রাদওয়ান বাহিনীর একটি সামরিক সদর দপ্তর।

এই দুই বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুদ্ধবিরতির পর সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করলেও দক্ষিণ লেবাননে নতুন হামলা সেই প্রত্যাশাকে আবারও অনিশ্চিত করে তুলছে।

সংঘাতের পটভূমি

লেবাননে সাম্প্রতিক সংঘাতের পেছনে রয়েছে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের বৈরিতা। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার পর লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তেও সংঘর্ষ তীব্র হয়ে ওঠে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর দুই দিনের মাথায় গত ২ মার্চ ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে এবং দক্ষিণ লেবাননের একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এরপর ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লেবাননের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

এই দীর্ঘ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এর মৌলিক বিরোধগুলোর সমাধান হয়নি। বিশেষ করে হিজবুল্লাহর অস্ত্র ও সামরিক উপস্থিতি এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী।

সামনে আরও উত্তেজনার আশঙ্কা

শনিবারের হামলায় ১১ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় যুদ্ধবিরতি কাঠামো নতুন করে পরীক্ষার মুখে পড়েছে। একদিকে ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তারা নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

এর মধ্যে লেবানন সরকার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটিকে কার্যকর রাখতে হলে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে হামলা বন্ধ করা, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ তৈরি করা এবং দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো।

কিন্তু শনিবারের প্রাণঘাতী হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সংঘাতের মূল কারণগুলো এখনো অমীমাংসিত। ফলে দক্ষিণ লেবাননে আবারও বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স