ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় সম্ভাব্য সমাবর্তনে যোগ দেওয়ার সম্মতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম তাঁকে সমাবর্তনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালে প্রধানমন্ত্রী তা গ্রহণ করেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সম্মতি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সাক্ষাৎকালে উপাচার্যের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক, সিন্ডিকেট সদস্য ও মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মো. মোর্শেদ হাসান খান উপস্থিত ছিলেন।
সমাবর্তনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ
সাক্ষাৎকালে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম আগামী জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সমাবর্তনে উপস্থিত থাকার সম্মতি দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সমাবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং তাঁদের অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে এ আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির সম্মতি এবারের সমাবর্তনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে শুধু সমাবর্তন নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন উপাচার্য।
উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত ২০ বছর মেয়াদি একাডেমিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের বিষয়েও তাঁকে জানানো হয়।
শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের সামঞ্জস্য তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টির বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে।
এ ছাড়া ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে বিশ্ববিদ্যালয় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন উপাচার্য। বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান যৌথ শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম এবং অ্যালামনাই নেটওয়ার্কিং সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন উপাচার্য।
বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা চাইলেন উপাচার্য
সাক্ষাৎকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও জাতীয় জীবনে এর ভূমিকার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন উপাচার্য।
মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের গৌরবময় অবদানের কথা উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
উপাচার্য বলেন, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক অবদান বিবেচনায় নিয়ে এর বিশেষ মর্যাদা নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় গুরুত্ব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে গবেষণা তহবিল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন উপাচার্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকে সময়োপযোগী করার অংশ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তৃতীয় ভাষা, জীববিজ্ঞান, জীবপ্রযুক্তি ও রোবোটিকসের মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে সহযোগিতা চান তিনি।
বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমবাজার ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও গবেষণাকে আরও আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উপাচার্য মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা গেলে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও বিশ্ববিদ্যালয় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
অ্যালামনাইদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর তাগিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে অ্যালামনাইদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল অ্যালামনাই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে গবেষণা, বৃত্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীও অ্যালামনাইদের সহযোগিতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর প্রস্তাব
শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁদের মধ্যে সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন উপাচার্য।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোতে সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, খেলাধুলা, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের মতো উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়েও সহযোগিতার কথা জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান শক্তিশালী করতে শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণার পরিধি বৃদ্ধি এবং অ্যালামনাইদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে এগিয়ে নিতে এর সাবেক শিক্ষার্থীদের সহযোগিতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
উন্নয়ন ও গবেষণায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর
সাক্ষাৎকারে আলোচিত বিষয়গুলো থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্পখাতের সঙ্গে সম্পর্ক—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান বাস্তবায়নের পাশাপাশি গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা আলোচনায় উঠে আসে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম বাড়ানো এবং তাঁদের সৃজনশীল ও মানবিক গুণাবলি বিকাশের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি উপাচার্যের কৃতজ্ঞতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মমত্ববোধ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তরিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়ায় উপাচার্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান।
আগামী জানুয়ারির সম্ভাব্য সমাবর্তনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের সম্মতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপাচার্যের এ সাক্ষাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবস্থান শক্তিশালী করার বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি সহযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।