চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরের জলাবদ্ধতার কথা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা ভুলে যাবেন—এমন মন্তব্য করে তিনি আগামী বর্ষায় আবারও লোক দেখানো তৎপরতার সমালোচনা করেছেন।
সারজিস আলম বলেছেন, বর্ষা শেষে শরৎ ও শীতের দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার বিষয়টি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সংসদ সদস্য ও মেয়রদের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে পারে। আগামী বর্ষায় আবারও জলাবদ্ধতার সময় পানিতে নেমে ছবি বা ভিডিও করার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের নাটক তিনি দেখতে চান না বলেও মন্তব্য করেন।
সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন সারজিস আলম। নগরের স্টেশন রোডের পর্যটন করপোরেশনের হোটেল সৈকতে চট্টগ্রাম মহানগর, চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলার উদ্যোগে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
‘বর্ষা শেষে সবাই ভুলে যাবেন’
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, বর্ষা শেষ হয়ে ধীরে ধীরে শরৎ ও শীতের দিকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সংসদ সদস্য ও মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে শুরু করবে এবং তাঁরা বর্ষায় চট্টগ্রাম কীভাবে ডুবে গিয়েছিল, তা ভুলে যাবেন।
তিনি বলেন, “বর্ষা শেষে আমরা ধীরে শরৎ-শীতের দিকে আগাচ্ছি। এই আগানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যাঁরা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আছেন, এখানে যাঁরা এমপি আছেন কিংবা মেয়র আছেন; তাঁদের স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে শুরু করবে। এবং তাঁরা ভুলে যাবেন, এই বর্ষায় কীভাবে চট্টগ্রাম ডুবে গিয়েছিল।”
সারজিসের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য বর্ষার বাইরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে বর্ষা এলেই নগরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের তৎপরতা চোখে পড়ে।
‘২০২৭ সালে এই নাটক আর দেখতে চাই না’
জলাবদ্ধতার সময় জনপ্রতিনিধিদের পানিতে নেমে ছবি বা ভিডিও করার প্রবণতারও সমালোচনা করেন এনসিপির এই নেতা।
তিনি বলেন, “আবার যখন বর্ষা আসবে, তখন তারা জামাকাপড় পরে শুটিং করার জন্য হাঁটুপরিমাণ, কোমরপরিমাণ পানিতে নামবে। এই নাটক ২০২৭ সালে আমরা আর দেখতে চাই না।”
তাঁর বক্তব্যে মূলত জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক লোক দেখানো কার্যক্রমের পরিবর্তে স্থায়ী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠে এসেছে। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্ষা আসার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। ভারী বৃষ্টিতে অল্প সময়ের মধ্যেই নগরের বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। সারজিস আলমের বক্তব্যে এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির বিষয়টি সামনে এসেছে।
রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি জঙ্গল সলিমপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের প্রসঙ্গ টেনে রাউজানের পরিস্থিতির সঙ্গে এর তুলনা করেন।
সারোয়ার তুষার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘ফিল্মি স্টাইলে’ জঙ্গল সলিমপুরে গিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মন্ত্রীর সেখানে যাওয়ার পর এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যেন এলাকাটি আগে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল এবং মন্ত্রীর সফরের পর তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
তবে জঙ্গল সলিমপুর থেকে অল্প দূরত্বে থাকা রাউজানে মন্ত্রীর যাওয়ার সময় হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রাউজানের ঘটনা রাজনৈতিকভাবে আলোচিত বা ‘ক্লিকবেট’ না হওয়ায় সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
রাউজানে ‘ওপেন ফায়ারিংয়ের’ অভিযোগ
সারোয়ার তুষারের দাবি, রাউজানে ‘ওপেন ফায়ারিং’ চলছে। দলীয় কোন্দল, দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেখানে অন্তত ২০ জনের বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
সারোয়ার তুষার বলেন, “তো চট্টগ্রামের মন্ত্রী হয়ে যদি চট্টগ্রামের তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করতে না পারেন, সারা দেশের অবস্থা বলাই বাহুল্য।”
তাঁর বক্তব্যে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে তিনি যে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উল্লেখ করেছেন, তা তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ হিসেবে এসেছে।
মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি নিয়েও অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি নিয়েও কথা বলেন সারজিস আলম। তিনি অভিযোগ করেন, মালয়েশিয়া পাঁচ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
সারজিসের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জনশক্তি রপ্তানির যে সিন্ডিকেট ছিল, তার একটি অংশ এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের একটি অংশ মিলে ২৫ জনের একটি নতুন সিন্ডিকেট তৈরি করেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানি-সংক্রান্ত ওই চুক্তিতে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথা তাঁরা শুনতে পাচ্ছেন।
তবে সংবাদ সম্মেলনে করা এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নথি বা নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন কি না, তা বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এগুলো সারজিস আলমের রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল নিয়েও বক্তব্য দেন সারজিস আলম। বর্তমান বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সারজিস বলেন, গ্রেড ওয়ান থেকে গ্রেড টোয়েন্টি পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে বেতন পান, তাতে অনেকের মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও সংসার চালানো কঠিন। তাঁর ভাষায়, মাসের ১৫ তারিখের পর থেকেই অনেককে ধার করতে শুরু করতে হয়।
তিনি বলেন, “বর্তমানে আমাদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একদম গ্রেড ওয়ান থেকে গ্রেড টোয়েন্টি পর্যন্ত যে স্কেলে বেতন দেওয়া হয়, এই বেতন দিয়ে কারও ১৫ তারিখ পর্যন্ত সংসার চলে না। ১৫ তারিখ পর থেকে ধার করা শুরু হয়।”
সরকারের প্রতি পে-স্কেল বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলতে বলতে সরকার ছয় মাস ধরে কালবিলম্ব করছে।
একাধিক ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা
চট্টগ্রামে সাংগঠনিক সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সারজিস আলম ও সারোয়ার তুষারের বক্তব্যে নগরের জলাবদ্ধতা, আইনশৃঙ্খলা, জনশক্তি রপ্তানি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর মতো একাধিক বিষয় উঠে আসে।
জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গে সারজিস আলমের মূল বক্তব্য ছিল, বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যাওয়ার পর সাময়িক তৎপরতার পরিবর্তে সারা বছর ধরে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কাজ করতে হবে। আগামী বর্ষায় আবারও জনপ্রতিনিধিদের পানিতে নেমে ছবি বা ভিডিও করার পরিবর্তে বাস্তব উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ দেখতে চান তিনি।
অন্যদিকে সারোয়ার তুষার চট্টগ্রামের রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ তুলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি সারজিস আলম মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেল নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন।
সব মিলিয়ে এনসিপির এই দুই নেতার বক্তব্যে চট্টগ্রামের স্থানীয় সমস্যা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের অর্থনীতি, প্রশাসন ও জনশক্তি রপ্তানি—বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের প্রতি চাপ ও জবাবদিহির দাবি উঠে এসেছে।