সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে এবং সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে গণভোটে দেওয়া জনগণের রায়কে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না করে বিভিন্ন সাংবিধানিক বিতর্ক সামনে আনা হচ্ছে।
এই গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদের ভেতরে আলোচনার পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথেও সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সংসদেই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত লংমার্চ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করা হয়। তবে দলীয় প্রস্তুতি ও অবস্থান তুলে ধরতেই জামায়াতের পক্ষ থেকে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে গণরায় এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে’
গণভোটের রায় নিয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি সরকার গণভোটকে অস্বীকার করে সেটিকে সংবিধানবিরোধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি করা রাষ্ট্রপতির আদেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ওই আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়ার বিধান সংবিধানে নেই—এমন যুক্তিও দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের অভিযোগ, এসব সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে এনে এবং সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।
তাঁর ভাষায়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই গণআকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা হলে তা নিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত লংমার্চে ছয়টি প্রধান দাবি তুলে ধরা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান গোলাম পরওয়ার। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারসংকটের নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
তিনি বলেন, এসব বিষয় শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের দাবি নয়; এগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ১১ দলীয় ঐক্য এসব দাবিকে সামনে রেখে কর্মসূচি পালন করছে।
লংমার্চকে জনগণের বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশা তুলে ধরার একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের চলমান সংকটগুলোর সমাধানও জরুরি।
৫ সেপ্টেম্বর শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে সমবেত হয়ে লংমার্চ শুরু হবে বলে জানান গোলাম পরওয়ার। সেখান থেকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের উদ্দেশে লংমার্চ যাবে।
তিনি জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা এই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন। তাঁদের মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) অলি আহমদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মামুনুল হকসহ জোটের নেতারা থাকবেন।
লংমার্চে ১১ দলের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতাও কামনা করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ কর্মসূচিতে অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সহযোগিতা পাওয়া গেলে আন্দোলনের পরিসর আরও বিস্তৃত হবে।
প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা
লংমার্চকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে পরমতসহিষ্ণুতার দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের কিছুটা ভোগান্তি হতে পারে। এ জন্য আগাম দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি। একই সঙ্গে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পালন করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
তাঁর বক্তব্যে লংমার্চকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে পালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা করেন, প্রশাসন কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা করবে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
‘রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের জায়গা পার্লামেন্ট’
গণভোটের রায় নিয়ে চলমান সাংবিধানিক বিতর্কের সমাধান কীভাবে হওয়া উচিত—এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সব বিতর্কের সমাধানের জায়গা সংসদ।
তিনি বলেন, তাঁরা এখনো চান বিষয়টির নিষ্পত্তি পার্লামেন্টের ভেতরেই হোক। সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব হলে সেটিই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পথ বলে মনে করেন তাঁরা।
তবে যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদে বিষয়টির সমাধান না হচ্ছে, ততক্ষণ নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে থাকার কথা জানান তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটে যে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে রাজপথে থাকার রাজনৈতিক দায়িত্ব তাঁরা পালন করতে চান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদে আলোচনার পথ খোলা রাখার পাশাপাশি জনগণের দাবিতে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিও চালিয়ে যাবে ১১ দলীয় ঐক্য।
খেলাফত মজলিস নিয়েও অবস্থান জানালেন
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম পরওয়ার বলেন, খেলাফত আন্দোলন ঐক্যের সঙ্গে রয়েছে। অন্যদিকে খেলাফত মজলিসও জোট থেকে বেরিয়ে গেছে—এমন কোনো কথা তারা বলেনি।
তাঁর ভাষ্য, দলীয় কিছু কার্যক্রমের কারণে খেলাফত মজলিস সাম্প্রতিক কয়েকটি বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেনি। তবে দেশের প্রয়োজন এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বার্থে দলটি তাঁদের সঙ্গে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের পরিসর ও কর্মসূচিতে শরিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, সেটি নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
রাজপথে সক্রিয় থাকার প্রস্তুতি
গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়টিকে সামনে রেখে ১১ দলীয় ঐক্য সংসদ ও রাজপথ—দুই জায়গাতেই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার পরিকল্পনা করছে।
একদিকে সংসদের ভেতরে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের সমাধানের আহ্বান জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির জন্য মাঠের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে ৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চকে সামনে রেখে ছয় দফা দাবি প্রচারের পাশাপাশি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন এবং মহানগর উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ সফল করতে সাংগঠনিক প্রস্তুতি, কর্মসূচির উদ্দেশ্য এবং ছয় দফা দাবি নিয়ে কথা বলেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের মধ্যেই ১১ দলীয় ঐক্যের এই লংমার্চের ঘোষণা এসেছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তাঁরা এখনো খোলা রাখতে চান। তবে সেই সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া জনগণের পক্ষে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তও তাঁরা নিয়েছেন। ৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চ সেই ধারাবাহিক কর্মসূচিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হতে যাচ্ছে।