ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিতর্ক যেন থামছেই না। বিশ্বকাপসহ সংস্থাটির বড় টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনার পর এবার তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধেই প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন আন্তর্জাতিক ফুটবলার। তাঁদের বক্তব্যে ফিফায় পরিবর্তন এবং নতুন যুগের দাবিও জোরালো হয়েছে।
বিশ্বকাপসহ ফিফার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোর আয়োজনে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার একটি পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই চাপের মুখে ছিলেন ইনফান্তিনো। পরে সেই উদ্যোগ থেকে সরে আসে ফিফা। তবে তাতেও বিতর্কের অবসান হয়নি। বরং এবার একদল সাবেক ও বর্তমান ফুটবলার যৌথ বিবৃতিতে ফিফার বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাঁদের মতে, বর্তমান পরিচালনব্যবস্থার কারণে ফুটবল তার ঐতিহ্য ও মৌলিক মূল্যবোধ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে।’
এই বিবৃতি প্রকাশকারীদের মধ্যে অন্যতম ফিফার ‘প্লেয়ার্স ভয়েস প্যানেল’-এর সদস্য মিকেল সিলভেস্ত্রে। ফ্রান্সের সাবেক এই ডিফেন্ডার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও আর্সেনালের হয়ে খেলেছেন এবং ইউনাইটেডের জার্সিতে চ্যাম্পিয়নস লিগও জিতেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতিটি প্রকাশ করে তিনি ফিফায় একটি ‘নতুন যুগ’ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।
সিলভেস্ত্রের সঙ্গে একই অবস্থান জানিয়েছেন ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার ও ফিফার সাবেক বর্ষসেরা নারী ফুটবলার লুসি ব্রোঞ্জ এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী সাবেক মিডফিল্ডার এমানুয়েল পেতিতও।
এর আগে ইনফান্তিনোর বিভিন্ন উদ্যোগে ফিফার কিছু ‘লেজেন্ডস’ সমর্থন জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে প্রতি দুই বছর পর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব নিয়েও তাঁদের সমর্থন ছিল। সেই গোষ্ঠীর একজনের এবার সরাসরি ফিফা সভাপতির নেতৃত্বের সমালোচনায় নামা তাই নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
যৌথ বিবৃতিতে ফুটবলাররা বলেন, বিশ্বের অসংখ্য সমর্থকের মতো তাঁদেরও ফিফার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, বর্তমান নেতৃত্বের সময়ে খেলাটির মৌলিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিবৃতিতে তাঁরা আরও জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর আর নীরব থাকা সম্ভব নয়। ফিফার ভেতরে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা সংস্থাটির প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করতে চান। তবে সেটির জন্য বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। ফুটবল পরিচালনার ক্ষেত্রে খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মতামতকে আরও কার্যকর ও সরাসরি গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তাঁরা বলেছেন।
এদিকে ফিফার সঙ্গে চলমান বিরোধের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে উয়েফার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে মোনাকোতে উয়েফার নির্বাহী কমিটির পাশাপাশি ৫৫ সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের অধিকাংশ সভাপতির অংশগ্রহণে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
এরই মধ্যে অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আগামী সপ্তাহে ইংল্যান্ডসহ কয়েকটি দলের পোল্যান্ডে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রতিযোগিতা উয়েফার বয়কটের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বয়কট প্রত্যাহারের জন্য উয়েফা ফিফার সামনে দুটি শর্ত রেখেছিল। প্রথম শর্ত ছিল বেসরকারি অংশীদারদের কাছে টুর্নামেন্টের অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনা বাতিল করা। ফিফা ইতিমধ্যে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু দ্বিতীয় শর্তটি এখনো পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছে উয়েফা। তাদের দাবি, ভবিষ্যতে খেলাধুলার স্বাভাবিক কাঠামোকে এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হবে না—এমন নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
এর মধ্যেই ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন ক্যামেরুন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এবং সাবেক চেলসি ও বার্সেলোনা তারকা স্যামুয়েল ইতো। তিনি ফিফার বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনাটি আবার আলোচনায় আনার পক্ষে মত দিয়েছেন।
সিএনএন স্পোর্টসকে দেওয়া বক্তব্যে ইতো ইনফান্তিনোর সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করেননি। তাঁর মতে, ইনফান্তিনো পুনর্নির্বাচিত হলে প্রকল্পটি পুনরায় আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সামনে ফিফা নির্বাচন থাকায় বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও জড়িয়ে থাকতে পারে।