ঢাকা

গুমের তদন্ত পুলিশের হাতে গেলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে: জামায়াত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
স্বাধীন সংস্থার হাতে তদন্তভার দেওয়ার দাবি শফিকুর রহমানের

গুমের মতো গুরুতর ও সংবেদনশীল অপরাধের তদন্তের ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হলে সেই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই গুমের অভিযোগ উঠেছে। ফলে একই বাহিনীর হাতে গুমের অভিযোগের তদন্তভার দেওয়া হলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি সামনে রেখে গতকাল শনিবার তিনি এ বিবৃতি দেন।

বিবৃতিতে জামায়াতের আমির বলেন, গুমের মতো সংবেদনশীল ও গুরুতর অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা উচিত। তাঁর মতে, মানবাধিকার কমিশনের মতো একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করা হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার সুযোগ বেশি থাকে।

পুলিশকে তদন্তভার দেওয়ার সমালোচনা

গুমের অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, গুমের মতো অপরাধের তদন্তে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই যখন গুমের অভিযোগ উঠেছে, তখন সেই বাহিনীর হাতেই এ ধরনের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।

তাঁর ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের তদন্তভার আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া একটি ‘অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত’।

জামায়াতের আমিরের বক্তব্য অনুযায়ী, গুমের অভিযোগের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা। তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকলে তদন্তের ফলাফল নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

ক্ষমতাসীন সরকারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ

বিবৃতিতে শফিকুর রহমান আরও দাবি করেন, অধিকাংশ গুমের ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারই সম্পৃক্ত থাকে। অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ ওঠার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর অভিযোগ, গুম-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এ কারণে সরকারের অধীনে থাকা কোনো তথ্যভান্ডারে গুমের ঘটনার তথ্য কতটা নিরপেক্ষভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে সরকারের তত্ত্বাবধানে তথ্য সংরক্ষণ করা হলে জনগণের সামনে প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি না।

মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়েও আপত্তি

প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনেরও সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। তাঁর দাবি, সরকার যে বিল প্রস্তাব করেছে, তাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত আইনের ফলে মানবাধিকার কমিশন কার্যত একটি ‘টুথলেস টাইগার’ বা ‘নখদন্তহীন বাঘে’ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাঁর মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে একটি কার্যকর ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। কমিশনের যদি স্বাধীনভাবে অভিযোগ তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা না থাকে, তাহলে ভুক্তভোগীদের অধিকার সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি

বিবৃতিতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর দাবি, শুধু যারা সরাসরি গুমের ঘটনায় অংশ নিয়েছে, তাদের বিচার করলেই হবে না। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তি এবং যাঁরা এসব ঘটনার পরিকল্পনা বা নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

তিনি গুমের সঙ্গে জড়িত ‘মাস্টারমাইন্ডদের’ শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

গুমকে বিশেষ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি

শফিকুর রহমান বলেন, নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা এবং আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করতে গুমকে একটি বিশেষ অপরাধ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি সরকারের প্রতি রাজনৈতিকীকরণের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি হলো নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো ব্যক্তিকে আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে সত্য তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে বার্তা

প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। গুমের ঘটনা প্রতিরোধ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই দিবসটি পালন করা হয়।

এই দিবস সামনে রেখে দেওয়া বিবৃতিতে শফিকুর রহমান বাংলাদেশের গুমের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পক্ষপাত বা রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়। ভুক্তভোগীদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনে স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাধীন তদন্ত সংস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর

জামায়াতের আমিরের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—গুমের অভিযোগের তদন্তে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, যেসব প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের বিরুদ্ধে অতীতে গুমের অভিযোগ উঠেছে, সেই একই কাঠামোর অধীনে তদন্ত পরিচালিত হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা থেকেই যায়।

এ কারণে মানবাধিকার কমিশনের মতো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গুমের অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা করার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।

একই সঙ্গে গুমের তথ্য সংরক্ষণ, অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন, ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে জবাবদিহি এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স