ঢাকা

ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা এখনো বহাল, প্রতিষ্ঠিত হয়নি নতুন বাংলাদেশ: মাহফুজ আলম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার থেকে জ্বালানি সংকট সমাধান—অল্টারনেটিভসের ৯ দফা দাবি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের সাহসী লড়াইয়ের পরও প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অল্টারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম। তাঁর দাবি, দেশে মোটাদাগে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে; শুধু সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। পুরোনো ব্যবস্থা নতুন মোড়কে ফিরে আসার আশঙ্কাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সমাধান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কারসহ নয়টি ক্ষেত্রে দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অল্টারনেটিভসের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন মাহফুজ আলম। ‘দেশের অবস্থা’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্ল্যাটফর্মটির লিখিত বিবৃতি পড়ে শোনান।

‘শুধু সরকারের পরিবর্তন হয়েছে’

লিখিত বক্তব্যে মাহফুজ আলম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের সাহসী লড়াই সত্ত্বেও প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

অল্টারনেটিভসের জাতীয় সাংগঠনিক কমিটির মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে মোটাদাগে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। তাঁদের দৃষ্টিতে পরিবর্তন মূলত সরকারের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে; রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন এখনো হয়নি।

মাহফুজ আলম আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পুরোনো ব্যবস্থা নতুন মোড়কে আবার ফিরে আসতে পারে। এ পরিস্থিতিতে জনগণকে স্বাধীনভাবে কথা বলা, সংগঠিত হওয়া এবং প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

প্রয়োজনে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকার কথাও বলেন অল্টারনেটিভসের এই সংগঠক।

রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের দাবি

অল্টারনেটিভসের নয় দফা দাবির অন্যতম প্রধান বিষয় হলো সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা।

প্ল্যাটফর্মটির মতে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য সাংবিধানিক সংস্কার এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে তারা।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমানো এবং দেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জুলাই গণহত্যার বিচার ও গুমের তালিকা প্রকাশ

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে অল্টারনেটিভস।

এর পাশাপাশি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মটি এসব ভুক্তভোগীকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

এ ছাড়া জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকার দাবি

মানবাধিকার কমিশন, গুম–সংক্রান্ত কমিশন এবং এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন) আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রেও মানবাধিকার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস।

তাদের মতে, এ ধরনের আইন ও প্রতিষ্ঠান কার্যকর করার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অল্টারনেটিভসের বক্তব্য অনুযায়ী, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানের দাবি

নয় দফা দাবির মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

প্ল্যাটফর্মটি কুইক রেন্টাল এবং অসম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।

একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমদানি, অলিগার্ক এবং বিদেশি কোম্পানিনির্ভরতা কমানোর কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটিয়ে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।

অল্টারনেটিভসের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাতে নতুন আইন ও সাশ্রয়ী ওষুধের দাবি

স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারও রয়েছে অল্টারনেটিভসের দাবির তালিকায়।

তারা ‘স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা অধ্যাদেশ–২০২৫’ এবং ‘রোগী সুরক্ষা ও প্রতিকার অধ্যাদেশ–২০২৫’ আইন হিসেবে প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে।

একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এবং মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতি প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।

এ ছাড়া নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

শ্রমিকদের পুনঃকর্মসংস্থান ও কারখানা চালুর দাবি

শ্রম খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রেও একাধিক দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস।

প্ল্যাটফর্মটি শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং শ্রম আইন, ২০২৬ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের দাবি করেছে।

বন্ধ কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি যেসব শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাঁদের পুনঃকর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া কৃষিখাতের সংকট নিরসনে সারসংকটের সমাধান এবং কৃষকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবিও রয়েছে।

বিশেষ করে কৃষকদের ক্যানসারসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

শিক্ষা খাতে স্বাধীন কমিশনের দাবি

শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর জন্য একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস।

তাদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করতে হবে।

সব খাতে দলীয় পক্ষপাতমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অল্টারনেটিভসের দাবি, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নয়ন প্রকল্প বাতিলের দাবি

নয় দফা দাবিতে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসকারী সব উন্নয়ন প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জলবায়ু সহনশীল প্রকল্প বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে তারা।

বন্যা, নদীভাঙন ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও রয়েছে।

পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান

সংবাদ সম্মেলনে মাহফুজ আলমের বক্তব্যে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও সমাজে প্রত্যাশিত পরিবর্তন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সেই প্রশ্নই মূলত সামনে এসেছে।

অল্টারনেটিভসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সরকারের পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের কাঠামো ও ক্ষমতার ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন এখনো হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে পুরোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো নতুন রূপে ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জনগণের স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার, সংগঠিত হওয়ার সুযোগ এবং প্রতিবাদ করার অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।

রাষ্ট্র সংস্কার থেকে শুরু করে অর্থনীতি, বিচার, মানবাধিকার, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শ্রম, শিক্ষা এবং পরিবেশ—বিভিন্ন খাতের সংস্কারকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

মাহফুজ আলমের নেতৃত্বাধীন অল্টারনেটিভসের নয় দফা দাবি মূলত জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাকে সামনে রেখে প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন এসব দাবি বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান ও কার্যকর পদক্ষেপ কী হয়, সেটিই হবে পরবর্তী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স