ঢাকার যানজট নিরসন ও গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত
রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন, ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর, গাবতলী বাস টার্মিনালের পেছনের অংশ সম্প্রসারণ, এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থা চালু এবং রাজধানীর অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে রাজধানীর চলমান যানজট পরিস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফ্লাইওভারে যানবাহনের চাপ, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, বাস টার্মিনাল পুনর্বিন্যাস, পার্কিং ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন বৈঠকের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানান।
গাবতলীতে যাবে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা কারওয়ান বাজারের যানজট ও সড়কে অতিরিক্ত চাপ কমাতে সেখানকার কিচেন মার্কেট গাবতলীতে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কারওয়ান বাজার রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও পরিবহনকেন্দ্রিক এলাকা হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পণ্যবাহী যানবাহন ও ক্রেতার সমাগম হয়। বিশেষ করে কাঁচাবাজারকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন ও কেনাবেচার কারণে ব্যস্ত সময়ে ওই এলাকায় যানবাহনের চাপ বাড়ে।
বৈঠকে বাজারটির কার্যক্রম অন্যত্র স্থানান্তরের মাধ্যমে কারওয়ান বাজার এলাকার সড়কে যানবাহনের চাপ কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক করার পাশাপাশি বাজারকেন্দ্রিক পণ্যবাহী যানবাহনের চাপও কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
টোল প্লাজায় চালু হবে ইটিসি
ঢাকার সড়ক ও উড়ালসড়কের ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজাগুলোতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইটিসি চালু হলে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় টোল আদায় দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা সম্ভব হবে। এতে টোল প্লাজায় যানবাহনের অপেক্ষার সময় কমানো এবং যান চলাচলের গতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে একটি অ্যাপ তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী চার মাসের মধ্যে অ্যাপটি তৈরির কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রযুক্তিনির্ভর টোল আদায় ব্যবস্থা চালু হলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও উড়ালসড়কে যান চলাচল আরও নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি টোল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান উড়ালসড়কে যানজট নিরসনে বুয়েটের প্রতিবেদন
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান উড়ালসড়কের আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান যানজট নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
এ এলাকায় যানজটের কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আগে প্রস্তুত করা একটি প্রতিবেদন পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বুয়েটকে বিদ্যমান প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ নতুন একটি প্রতিবেদন আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যানজটের কারণ, সড়কের সক্ষমতা, যানবাহনের প্রবাহ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল যাবে কেরানীগঞ্জে
রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে আন্তজেলা বাসের চাপ কমাতে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করে টার্মিনাল স্থানান্তরের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় হওয়ায় আন্তজেলা বাস ও অন্যান্য যানবাহনের কারণে আশপাশের সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। টার্মিনালটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা গেলে ঢাকার কেন্দ্রীয় অংশে বাস ও আন্তজেলা যানবাহনের চাপ কমবে বলে বৈঠকে আলোচনা করা হয়।
তবে স্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্প এলাকায় ১৫ একর জমিতে অস্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই অস্থায়ী টার্মিনাল আগামী চার মাসের মধ্যে নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গাবতলী টার্মিনাল সম্প্রসারণ
রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম প্রবেশপথে যানবাহন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে গাবতলী বাস টার্মিনালের পেছনের অংশ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাসের অবস্থান ও চলাচল আরও সুশৃঙ্খল করার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ফুলবাড়িয়া থেকে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে গাবতলী টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে।
সচিবালয় এলাকায় পার্কিং বাড়ানোর উদ্যোগ
সচিবালয় ও এর আশপাশের এলাকায় যানজট নিরসনে পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।
এ লক্ষ্যে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিকল্প পার্কিংয়ের স্থান চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়কেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আশপাশের সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অটোরিকশা চলাচলে পৃথক নীতিমালা
রাজধানীতে অটোরিকশা চলাচলকে আরও সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত করতে পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকে অটোরিকশার চলাচল, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজধানীর সড়কে অনুমোদনহীন ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল কমিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর অংশ হিসেবেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে জোর
রাজধানীর যানজট নিরসনে শুধু একটি সংস্থার উদ্যোগ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সড়ক বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে রাজধানীর যানজটকে কেবল সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা হিসেবে না দেখে বাস টার্মিনাল, বাজার, পার্কিং, গণপরিবহন, টোল ব্যবস্থা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তরিক ও সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন।
বৈঠকে যারা ছিলেন
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর যানজট নিরসন ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নেওয়া এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে কয়েকটির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট স্থানান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণ, টোল প্লাজায় ইটিসি ব্যবস্থা চালু এবং যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান উড়ালসড়কের যানজট নিরসনে বুয়েটের সুপারিশ—এসব উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই রাজধানীর যানজট ব্যবস্থাপনায় এর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।