ঢাকা

কারিগরি শিক্ষায় শিল্পের সম্পৃক্ততা বাড়াতে চীনের মডেল: শিক্ষামন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে শিল্প খাতের কার্যকর সংযোগ স্থাপনে চীনের মডেল বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদার সমন্বয় ঘটিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন। সম্প্রতি তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশি একটি প্রতিনিধিদল চীন সফর করে। সফরে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। সেই সফরের অভিজ্ঞতা ও অর্জন তুলে ধরতেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

প্রতিনিধিদলে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব দাউদ মিয়া। তাঁরা তিন দিনের সফরে চীনে গিয়ে দেশটির কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা নেন।

চীনের মডেলে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয়

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কারিগরি শিক্ষায় ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ’ বা শিক্ষা ও শিল্প খাতের সংযোগ জোরদার করতে সরকার চীনের মডেল অনুসরণ করতে আগ্রহী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বর্তমান সময়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করা কারিগরি শিক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি থাকে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে দূরত্ব কমানোকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার পাঠক্রম, প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

চীন সফরে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে সমঝোতা

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব তিন দিনের চীন সফর করেন। সফরকালে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেন তাঁরা।

সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল চীনের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা কীভাবে আরও বিস্তৃত করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।

চীনের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছে সরকার।

তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার কথা প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টার

সংবাদ সম্মেলনে চীন সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে নতুন মাত্রা ও নতুন ধারায় এগিয়ে যেতে পারে।

তাঁর মতে, দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হলে এর মাধ্যমে শুধু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নয়, কর্মসংস্থান ও পেশাগত ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

কারিগরি শিক্ষাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দক্ষতা অর্জন ও কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চীনের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি শিক্ষায় জোর

সরকারের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারিগরি শিক্ষাকে আরও বেশি কর্মসংস্থানমুখী করা। শুধু সনদ বা ডিগ্রি অর্জনের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনা শেষ করে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারেন, সে ধরনের দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এ ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শিল্পের বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু নির্ধারণ, ব্যবহারিক শিক্ষা বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা দেওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প খাতের প্রয়োজনীয়তা ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে কারিগরি শিক্ষার প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন। ফলে কোন খাতে কী ধরনের দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেই চাহিদার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা

কারিগরি শিক্ষায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

দুই দেশের তরুণদের মধ্যে শিক্ষা ও পেশাগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হলে এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।

সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কারিগরি শিক্ষাকে এমন একটি ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ থাকবে। এতে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন আধুনিক প্রযুক্তি ও তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করবেন, অন্যদিকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে সেই জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগও পাবেন।

চীন সফরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে এ ধরনের শিল্প-শিক্ষা সংযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স