ঢাকা

প্রথমবার বৈঠকে বসছে মক্কা প্রতিরক্ষা জোট, কারা থাকছেন, আলোচনায় কী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় গঠিত নতুন জোটের প্রথম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আজ সোমবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈঠকে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের শীর্ষ কূটনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি তিন দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ যৌথ কার্যক্রমের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এএফপি ও তুর্কিয়ে টুডে জানিয়েছে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় গঠিত ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ আজ প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসছে। এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে নতুন প্রতিরক্ষা জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজও শুরু হতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে সৌদি আরবের মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিন দেশের যেকোনো একটি আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সহায়তা দেবে।

কেন এই প্রতিরক্ষা জোট

নতুন এই প্রতিরক্ষা উদ্যোগের পেছনে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এবং তেহরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবেই মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে দেখা হচ্ছে।

তিন দেশের সামরিক সক্ষমতাও একে অপরের জন্য পরিপূরক। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং দেশটির রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সক্ষমতা। পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এবং দেশটির রয়েছে বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি।

ফলে তিন দেশের সমন্বিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

কারা অংশ নিচ্ছেন

ইস্তাম্বুলের বৈঠকে তিন দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর প্রধানরাও অংশ নেবেন।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান অংশ নেবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলের এবং সেনাপ্রধান জেনারেল সেলচুক বায়রাকতারওগ্লু।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বৈঠকে অংশ নেবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। পাকিস্তানের এই প্রতিনিধিরা এরই মধ্যে তুরস্কে পৌঁছেছেন।

সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বৈঠকে থাকার কথা রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ফাইয়াদ বিন হামেদ আল-রুওয়াইলির।

অর্থাৎ বৈঠকে তিন দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এর ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতার বাস্তব দিকগুলো নিয়েও সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।

আলোচনায় থাকবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি

আজকের বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় হতে পারে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব নিয়ে তিন দেশের প্রতিনিধিরা মতবিনিময় করতে পারেন।

মক্কা চুক্তির আওতায় সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক নিরাপত্তার বিষয়টি যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ, তাই ভবিষ্যতে কোনো নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে তিন দেশের মধ্যে কীভাবে দ্রুত সমন্বয় করা হবে, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

তিন দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করাও বৈঠকের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ, তথ্য বিনিময় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে তিন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের জন্য ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, তার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

এ ধরনের সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে তিন দেশের সামরিক বাহিনীর পারস্পরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা বাড়বে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতাও তৈরি হতে পারে।

প্রতিরক্ষা শিল্পেও সহযোগিতার পরিকল্পনা

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট শুধু সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না—প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

আজকের বৈঠকে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

তুরস্ক গত কয়েক বছরে ড্রোন, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পাকিস্তানেরও নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও সামরিক প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা রয়েছে। সৌদি আরবও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা শিল্পের স্থানীয় সক্ষমতা বাড়াতে আগ্রহী।

তিন দেশের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময় ও উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা জোটটির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাও আলোচনায়

সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় যৌথ তৎপরতা জোরদারের বিষয়টিও আজকের বৈঠকে আলোচিত হতে পারে।

তিন দেশেরই বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে তিন দেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সচিবালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি সচিবালয় এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও আজকের বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে।

‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ কোন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কী হবে এবং ভবিষ্যতে জোটের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ে একটি প্রাথমিক কাঠামো নির্ধারণ করা হতে পারে।

একই সঙ্গে আগামী দিনগুলোতে জোটের পক্ষ থেকে কী ধরনের কার্যক্রম নেওয়া হবে, তার একটি কর্মপরিকল্পনাও নির্ধারণ করা হতে পারে।

এ কারণে আজকের বৈঠককে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রথম বৈঠক হিসেবে নয়, বরং নতুন জোটের কার্যকর কাঠামো তৈরির প্রাথমিক ধাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সদস্য বাড়ানোর উদ্যোগ

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটকে তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। এরই মধ্যে আরও কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জোটের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও মানদণ্ড থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে জোটের সদস্যসংখ্যা বাড়লে এর রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্বও বাড়তে পারে।

তবে নতুন সদস্য যুক্ত হলে প্রতিটি দেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর সমন্বয় কীভাবে করা হবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশও আগ্রহী

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশও আগ্রহ দেখিয়েছে।

গতকাল রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, মক্কা চুক্তির বিষয়ে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা চলছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে দেশ দুটির অবস্থান ইতিবাচক।

বাংলাদেশ সরকার এ জোটে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি দেখছে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ জোটটির পরিধি দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সামনে যে প্রশ্নগুলো

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু সেই অঙ্গীকার বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কোন পরিস্থিতিকে ‘আক্রমণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, আক্রান্ত দেশকে কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া কী হবে এবং সদস্যদেশগুলোর সামরিক বাহিনী কীভাবে সমন্বিতভাবে কাজ করবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো প্রয়োজন হবে।

আজকের বৈঠক সেই কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে প্রথম বড় পদক্ষেপ হতে পারে।

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে তাই শুধু তিন দেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা নয়, বরং ভবিষ্যতের সামরিক সহযোগিতার ভিত্তিও নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন সদস্য যুক্ত হলে এবং যৌথ প্রতিরক্ষা, প্রতিরক্ষা শিল্প ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জোটটি মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতায় একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তথ্যসূত্র: এএফপি ও তুর্কিয়ে টুডে

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স