ঢাকা

পিএসসির চেয়ারম্যান নিয়োগে বিলম্ব কেন, সামনে যে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে সরকার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং


বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এখনো নতুন চেয়ারম্যান পায়নি। গত ১৮ আগস্ট অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম পদত্যাগ করার পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

প্রশাসন ও পিএসসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে মূলত দুটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। একজন অভিজ্ঞ সাবেক আমলা পিএসসির নেতৃত্ব দেবেন, নাকি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ কোনো শিক্ষাবিদকে দায়িত্ব দেওয়া হবে—এ নিয়েই সিদ্ধান্তে কিছুটা সময় লাগছে।

আমলা নাকি শিক্ষাবিদ—কোন দিকে ঝুঁকছে সরকার?

জনপ্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে, বিসিএস ক্যাডার এবং সরকারি প্রশাসনের বাস্তব কাঠামো সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা রয়েছে সাবেক আমলাদের। তাদের মতে, প্রশাসনের ভেতরের কাজের ধরন, ক্যাডার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ আমলা এগিয়ে থাকবেন।

তবে পিএসসি-সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মত ভিন্ন। তাদের মতে, অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের দায়িত্ব পালনকালে পরীক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা গেছে। বিশেষ করে পরীক্ষা-জট কমানো, বিসিএসের ফল দ্রুত প্রকাশ, ‘এক বছরে এক বিসিএস’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, লিখিত পরীক্ষায় সার্কুলার ইভালুয়েশন এবং মৌখিক পরীক্ষায় দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের মতো উদ্যোগ আলোচনায় আসে।

এ ছাড়া নিজস্ব ডিজিটাল প্রেসের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছাপানোর উদ্যোগও পিএসসির কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। যদিও তাঁর সময়ে বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নে বানান ভুলসহ কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী কীভাবে নিয়োগ হয়

পিএসসি বাংলাদেশের একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের ১৩৭ অনুচ্ছেদে কমিশনের কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগের বিষয়ে রয়েছে ১৩৮(১) অনুচ্ছেদ।

নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে পিএসসির চেয়ারম্যান নিয়োগ করেন। ফলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি রাষ্ট্রপতির দপ্তরে যাওয়ার কথা।

রাষ্ট্রপতির দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রোববার পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পিএসসির চেয়ারম্যান পদে কোনো সুপারিশ বা প্রার্থীদের তালিকা সেখানে পৌঁছায়নি। প্রস্তাব পাওয়ার পর সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের পর নতুন আলোচনা

অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের কারণ হিসেবে অসুস্থতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও সংশ্লিষ্ট মহলে পিএসসি ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে টানাপোড়েনের বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর পিএসসির স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর পদত্যাগের পর নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি তাই শুধু একজন ব্যক্তিকে নির্বাচনের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে পিএসসির ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও সংস্কারের ধারাবাহিকতার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।

নতুন চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে কী যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার মতে, চেয়ারম্যান পরিবর্তনকে শুধু ব্যক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখলে বিষয়টির মূল গুরুত্ব বোঝা যাবে না। তাঁর দৃষ্টিতে, পিএসসির নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা না থাকলে পরীক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

নতুন চেয়ারম্যান বাছাইয়ের সময় তিনি শুধু প্রার্থী আমলা নাকি শিক্ষক—সেটিকে প্রধান বিবেচনা না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রার্থীর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পিএসসির চেয়ারম্যানকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে হবে বলেও তিনি মনে করেন। কারণ পিএসসির দায়িত্ব কেবল সরকারি চাকরির পরীক্ষা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের জন্য যোগ্য জনবল বাছাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও এই প্রতিষ্ঠানের।

৫০তম বিসিএসের কার্যক্রম চলছে

নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত পিএসসির জ্যেষ্ঠ সদস্য নাজমুল আমীন মজুমদারের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। ৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

চাকরিপ্রার্থীদের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা, নতুন চেয়ারম্যান এমন একজন হবেন যিনি পিএসসির সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিতে পারবেন। বিশেষ করে দ্রুত বিসিএস সম্পন্ন করা এবং ‘এক বছরে এক বিসিএস’ পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগে সরকারের সামনে এখন শুধু একজন যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করার প্রশ্ন নয়; বরং পিএসসির স্বাধীনতা, সংস্কারের ধারাবাহিকতা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং পরীক্ষার্থীদের আস্থা—সবকিছুর সমন্বয় ঘটানোই বড় চ্যালেঞ্জ।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স