ঢাকা

ওমরাহ শেষে দেশে ফিরে মক্কা চুক্তি নিয়ে সরকারের অবস্থানকে ইতিবাচক বললেন আসিফ মাহমুদ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সৌদি আরবের সঙ্গে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে সরকারের আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত স্বাধীনতা ও ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

আসিফ মাহমুদ বলেছেন, বাংলাদেশের উচিত সব পক্ষ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ খোলা রেখে যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক বা সামরিক চুক্তিতে যাওয়া। কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সৌদি আরবে পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে সোমবার সকালে দেশে ফেরেন আসিফ মাহমুদ। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এনসিপির মুখপাত্রের পাশাপাশি তিনি দলটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ডায়াস্পোরাবিষয়ক উপকমিটির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

মক্কা চুক্তিতে যোগদানের বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে সরকারের আগ্রহ প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, বিষয়টিকে তাঁরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে এ ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তাঁর মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত স্বাধীনতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে গিয়ে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক বা কৌশলগত সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে।

আসিফ মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের জন্য সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার দরজা খোলা থাকা প্রয়োজন। সেই অবস্থান বজায় রেখেই বাণিজ্যিক কিংবা সামরিক—যে ধরনের চুক্তিই করা হোক না কেন, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

দেশের চলমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, অতিরিক্ত দাম ও বিভিন্ন ধরনের ‘ভুতুড়ে বিল’ পরিশোধ করার পরও নাগরিকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের এই পরিস্থিতি দেশের সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, সংকট আরও গভীর হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে অতীতের সংকটপূর্ণ সময়ের সঙ্গে তুলনা করে আসিফ মাহমুদ বলেন, পরিস্থিতি আবারও ২০০৫ সালের আগের সময়ের মতো সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।

তাঁর বক্তব্যে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি এর মূল্য, বিল এবং নাগরিকদের ওপর আর্থিক চাপের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, জনগণের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি যদি প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎও নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সংকট আরও তীব্র হবে।

প্রবাসী শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

প্রবাসী শ্রমবাজারে অনিয়ম এবং বিদেশযাত্রার ব্যয় নিয়েও কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। বিশেষ করে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিমান টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।

আসিফ মাহমুদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সৌদি আরবগামী বিমানের টিকিটের দাম প্রায় ৩৫০ ডলার বা প্রায় ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেমে এসেছিল। বর্তমানে সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে একই টিকিটের দাম ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন খাতে নতুন করে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

তাঁর মতে, প্রবাসী কর্মীদের বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে চাপ তৈরি করে না, এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও পড়তে পারে। তাই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে বিদেশযাত্রার ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারেও বাড়তি ব্যয়ের অভিযোগ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের কর্মীদের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় যেতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

তাঁর দাবি, একজন বাংলাদেশি কর্মীর মালয়েশিয়ায় যেতে প্রায় ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এ পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ হিসেবে দেখছেন না তিনি।

প্রবাসী কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার খরচ কমানোর পাশাপাশি শ্রমবাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এনসিপির এই নেতা।

তিনি মনে করেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিতে গিয়ে একজন শ্রমিককে যদি বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাহলে তাঁর ওপর ঋণ ও আর্থিক চাপ তৈরি হয়। ফলে শ্রমবাজারে স্বচ্ছতা আনা এবং কর্মীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী করা জরুরি।

১১ দলের লংমার্চ জনগণের কষ্ট তুলে ধরার কর্মসূচি

এ সময় ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত লংমার্চ নিয়েও কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, লংমার্চের মাধ্যমে তাঁরা মূলত সাধারণ মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগের বিষয়গুলো সামনে আনতে চান।

তাঁর মতে, কর্মসূচিটি শুধু তাঁদের সংস্কারসংক্রান্ত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অংশ নয়; বরং দেশের বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিরুদ্ধেও এটি একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি।

আসিফ মাহমুদ বলেন, জনগণের দৈনন্দিন জীবনে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিকভাবে কথা বলা এবং সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই লংমার্চের অন্যতম উদ্দেশ্য।

জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান

সামগ্রিকভাবে আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জ্বালানি পরিস্থিতি, প্রবাসী শ্রমবাজার এবং চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানালেও তিনি একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো একটি পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বাংলাদেশের জন্য সব রাষ্ট্র ও অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ রাখতে হবে।

অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রবাসী শ্রমবাজারে উচ্চ ব্যয়ের বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

আসিফ মাহমুদের বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের অর্থনৈতিক চাপ কমানো, বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিতেও ভারসাম্য বজায় রাখা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর এসব ইস্যুকে সামনে রেখেই ১১ দলীয় জোটের লংমার্চকে রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে এনসিপি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স