ঢাকা

আর্থিক চাপ কাটাতে ফক্সভাগেনের ছাঁটাই পরিকল্পনা, ঝুঁকিতে ১ লাখ ৪০ হাজার কর্মী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের পুনর্গঠন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জার্মানির গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফক্সভাগেন। প্রতিষ্ঠানটি অন্তত ১০ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিপুলসংখ্যক কর্মী চাকরি হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ফক্সভাগেনের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ ১ লাখ চাকরি কমানোর কথা বলা হয়েছে। তবে শ্রমিক ইউনিয়ন আইজি মেটালের হিসাব আরও বড়। ইউনিয়নটির আশঙ্কা, সরাসরি ফক্সভাগেনের কর্মীদের পাশাপাশি সরবরাহকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মসংস্থানও বিবেচনায় নিলে চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বজুড়ে ফক্সভাগেনের কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৫৭ হাজার। ফলে প্রস্তাবিত কর্মীসংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীবাহিনীতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

জার্মানির এমডেন, হ্যানোভার ও জভিকাউ কারখানাগুলোকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকা উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব কারখানায় উৎপাদন কমানো বা পুনর্গঠনের প্রভাব কর্মীদের ওপর সরাসরি পড়তে পারে।

ছোট হবে গাড়ির মডেলের তালিকা

ফক্সভাগেনের ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার পেছনে জার্মানিতে উৎপাদন ব্যয়ের উচ্চ হার অন্যতম কারণ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার দাবি, দেশটির কারখানাগুলোতে উৎপাদন খরচ প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু প্রতিষ্ঠানের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি

এই বাড়তি ব্যয় কমাতে ইউরোপে গাড়ি উৎপাদনের সক্ষমতা বছরে ৫ লাখের বেশি ইউনিট কমানোর কথা বিবেচনা করছে ফক্সভাগেন।

শুধু উৎপাদন সক্ষমতা কমানোই নয়, গাড়ির মডেলের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে গাড়ির মডেলের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হতে পারে। একই সঙ্গে গাড়ির বিভিন্ন সরঞ্জাম, ফিচার ও বিকল্পের সংখ্যাও সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এর মাধ্যমে উৎপাদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, যন্ত্রাংশের বৈচিত্র্য কমানো এবং প্রতিটি গাড়ি তৈরিতে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করবে প্রতিষ্ঠানটি।

কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ

ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে ফক্সভাগেনের কর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর আগে কর্মীরা হাজার হাজার চাকরি কমানোর একটি পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছিলেন। সেই সমঝোতার পর আবারও বড় পরিসরে কর্মী ছাঁটাইয়ের সম্ভাবনা সামনে আসায় কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস বাড়ছে।

শ্রমিকদের দৃষ্টিতে, বারবার কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমানোর পরিকল্পনা জার্মানির ঐতিহ্যবাহী গাড়ি শিল্পের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

শ্রমিক ইউনিয়ন আইজি মেটাল তাই শুধু কর্মী ছাঁটাইয়ের সংখ্যা নয়, ফক্সভাগেনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়েও ব্যবস্থাপনার কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছে।

মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও বিতর্ক

কর্মী ছাঁটাই ও ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে মুনাফার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করতে চায় ফক্সভাগেন।

তবে প্রতিষ্ঠানটির কাঙ্ক্ষিত মুনাফার হার নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফক্সভাগেন ৯ শতাংশ মুনাফার মার্জিন অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করছে। অন্যদিকে জার্মানির কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে ফক্সভাগেনের মুনাফার মার্জিন প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমান অবস্থান থেকে প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রায় যেতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে মুনাফার সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।

আইজি মেটালের প্রধান ক্রিস্টিয়ানে বেনার এই লক্ষ্যমাত্রার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, যথেষ্ট বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া এত বড় মুনাফার লক্ষ্য নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি এটিকে ‘আকাশকুসুম’ লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে ব্যবস্থাপনার কাছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দাবি করেছেন।

বৈশ্বিক গাড়ি বাজারের প্রতিযোগিতায় চাপ

ফক্সভাগেনের এই পুনর্গঠন পরিকল্পনার পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যয়ই নয়, বৈশ্বিক গাড়ি বাজারের পরিবর্তিত প্রতিযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন নির্মাতার ওপর উৎপাদন খরচ কমানোর চাপ তৈরি হয়েছে।

জার্মানিতে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় ফক্সভাগেনকে তুলনামূলক কম খরচে গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কাঠামো সরল করা, মডেলের সংখ্যা কমানো এবং কর্মী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।

তবে শ্রমিক ইউনিয়নের দৃষ্টিতে ব্যয় কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবে কর্মী ছাঁটাইকে বেছে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান নাও করতে পারে।

ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়ছে চাপ

ফক্সভাগেনের পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিষ্ঠানের তদারকি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি ও জার্মানির লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্যের প্রভাব।

ফক্সভাগেনের তদারকি বোর্ডে লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজ্যটির হাতে কোম্পানির কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। ফলে বড় পরিসরে কর্মী ছাঁটাই বা উৎপাদনকেন্দ্র পুনর্গঠনের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া ব্যবস্থাপনার জন্য সহজ হবে না।

২০৩০ সালের ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে তদারকি বোর্ডকে রাজি করাতে ব্যবস্থাপনার হাতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় রয়েছে। এর আগে জুলাই মাসেও বোর্ডে কর্মী প্রতিনিধি এবং রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল।

ফলে ফক্সভাগেনের সামনে এখন একদিকে ব্যয় কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে কর্মী ও শ্রমিক ইউনিয়নের বিরোধিতা এবং তদারকি বোর্ডের অনুমোদনের প্রশ্ন—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

বড় রূপান্তরের মুখে ফক্সভাগেন

ফক্সভাগেনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কাঠামো, কর্মীসংখ্যা এবং গাড়ির মডেলের বৈচিত্র্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সর্বোচ্চ ১ লাখ সরাসরি চাকরি কমানোর সম্ভাবনার সঙ্গে সরবরাহকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়ে মোট কর্মসংস্থান ক্ষতির সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বিষয়টি শুধু একটি কোম্পানির পুনর্গঠন নয়, জার্মানির শিল্প ও শ্রমবাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ফক্সভাগেনের ব্যবস্থাপনা মনে করছে, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং মুনাফার হার বাড়ানো ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে শক্ত অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।

তবে পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কতসংখ্যক কর্মী ছাঁটাই হবে এবং কোন কোন কারখানা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে—তা নির্ভর করছে ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক ইউনিয়ন ও তদারকি বোর্ডের মধ্যে চলমান আলোচনার ওপর।

তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স