ঢাকা

বিরোধীদলীয় এমপিদের সংসদে অপদস্থ করা হচ্ছে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জাতীয় সংসদে সংসদীয় রীতি ও ভাষা অনুসরণ না করে তির্যক বক্তব্যের মাধ্যমে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের অপদস্থ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। সরকার একদিকে সংবিধানের কিছু সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জুলাইয়ের আন্দোলনে নিহতদের রক্তের প্রতিদান দেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জনগণের মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে পারছে না।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।

সংসদে বিরোধীদের প্রতি আচরণ নিয়ে অভিযোগ

মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যথাযথ সংসদীয় আচরণ করা হচ্ছে না। সংসদীয় ভাষার পরিবর্তে তির্যক ভাষা ব্যবহার করে তাঁদের অপদস্থ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু সংসদে নয়, বিভিন্ন জায়গায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। তাঁর দাবি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের মতামত ও সমালোচনার প্রতি সহনশীলতা থাকা প্রয়োজন।

সরকার নিজেকে পরমতসহিষ্ণু ও গণতন্ত্রের প্রতি আন্তরিক হিসেবে তুলে ধরছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের সেই অবস্থানের বাস্তব প্রমাণ দিতে হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়

জামায়াতের এই নেতা বলেন, সরকার সংবিধানের কিছু সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জুলাইয়ের রক্তের প্রতিদান দেওয়ার কথা বলছে। তবে সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের মধ্যে এখনো সংশয় রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, সরকারকে এই আস্থার সংকট দূর করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের কোনো কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষের মধ্যে অনাস্থা আরও বাড়ে—এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, সরকার গত ছয় মাসে জনদুর্ভোগ কমাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার দ্বিচারিতা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

লংমার্চে বাধা না দেওয়ার আহ্বান

চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলের ঘোষিত লংমার্চে কোনো ধরনের বাধা না দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, সরকার যদি সত্যিই পরমতসহিষ্ণু ও গণতন্ত্রের প্রতি আন্তরিক হয়, তাহলে লংমার্চের কর্মসূচিতে বাধা না দিয়ে তার প্রমাণ দিতে পারে।

লংমার্চে কী পরিমাণ জ্বালানি খরচ হবে—সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী এ নিয়ে হিসাব করছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, লংমার্চে এক লাখ লিটার তেল খরচ হবে—এমন বক্তব্য হাস্যকর।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, যেসব গাড়ি আগে রাস্তায় চলত, সেগুলোই লংমার্চের গাড়িবহরে চলবে। তাই গাড়ি বন্ধ করে জ্বালানি সংকটের সমাধান করা যাবে না। তাঁর মতে, গাড়ি চলবে এবং একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটেরও সমাধান করতে হবে।

৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ

মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলের লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।

কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত রাজধানীর শাপলা চত্বরে এক ঘণ্টার সমাবেশ হবে। এরপর লংমার্চের গাড়িবহর চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা করবে।

পথে কয়েকটি স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী প্রথম পথসভা হবে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে। এরপর কুমিল্লার পদুয়ার বাজার, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পথসভা হবে। সর্বশেষ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে।

পথসভায় থাকবেন ১১ দলের শীর্ষ নেতারা

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জানান, লংমার্চের সব পথসভায় ১১ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। তবে প্রত্যেক পথসভায় সব নেতা বক্তব্য দেবেন না। কোন পথসভায় কোন নেতা বক্তব্য দেবেন, তা আগেই নির্ধারণ করা থাকবে।

এ ছাড়া লংমার্চের গাড়িবহরে থাকা ১১ দলের নেতা-কর্মীদের গাড়ি থেকে না নামার নির্দেশনা থাকবে বলেও জানান তিনি।

গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চের মূল গাড়িবহরে প্রায় এক হাজার গাড়ি থাকবে। এর বাইরে পথের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও গাড়ি বহরে যুক্ত হতে পারে।

যানজটের আশঙ্কা স্বীকার

লংমার্চের কারণে যানজট সৃষ্টি হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বড় পরিসরের কোনো লংমার্চে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

তবে যানজট কমানোর জন্য সড়কের দুই লেনের একটি লেনে লংমার্চের গাড়িবহর চালানোর এবং অন্য লেনটি সাধারণ যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।

লংমার্চের রুটে বসবাসকারী ও চলাচলকারী মানুষের কাছে এ কারণে আগাম দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছেন বলেও জানান জামায়াতের এই নেতা।

অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা নেই

লংমার্চের পথে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা করছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই মুহূর্তে তাঁরা তেমন কোনো আশঙ্কা করছেন না।

তিনি জানান, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) ছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশকে কর্মসূচির বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

তাঁর মতে, কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

বাধা এলে কঠিন প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি

মতবিনিময় সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, লংমার্চে কোনো বাধা দেওয়া হলে তাঁরা কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

তিনি বলেন, বাধা দেওয়া হলে পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যেতে পারে। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, সরকার কর্মসূচিতে কোনো বাধা দেবে না।

লংমার্চকে কেন্দ্র করে ১১ দলের ঐক্য আরও দৃঢ় হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেন, দেশের মানুষ লংমার্চের দিকে তাকিয়ে আছে। জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর প্রত্যাশা, এসব কারণে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাবে এবং কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হবে।

লংমার্চে তেলের ব্যবহার নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা নিয়েও কথা বলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী লাল বাসে সারা দেশে ঘুরছেন এবং এসব সফরে অনেক সফরসঙ্গীও থাকছেন। একই সঙ্গে বিমানে যাতায়াতও হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, সেখানে যদি তেলের সংকট না থাকে, তাহলে বিরোধী দলের লংমার্চে তেলের সংকট কেন হবে।

কৃত্রিম যানজট তৈরির অভিযোগ

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ ঘোষণার পর কয়েক দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কৃত্রিম যানজট তৈরি করা হচ্ছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, লংমার্চের দিন সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের মাধ্যমে কৃত্রিম যানজট তৈরি করা হবে না।

তাঁদের প্রত্যাশা, কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের স্বাভাবিকভাবে চট্টগ্রামে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

১১ দলের নেতাদের বক্তব্য

মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আব্দুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলামসহ অন্য নেতারা।

সভায় বক্তারা জ্বালানি সংকট, জনদুর্ভোগ, সরকারের কার্যক্রম এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধার আশঙ্কা নিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

লংমার্চকে তাঁরা সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সরকারের সহযোগিতার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে কর্মসূচির কারণে জনদুর্ভোগ ও যানজটের আশঙ্কার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে রুটে সাধারণ যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা এবং স্থানীয় মানুষের কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশের কথা বলা হয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, ৫ সেপ্টেম্বরের চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ কতটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং কর্মসূচিকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক জোটের মধ্যে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা পরবর্তী সময়ে কোন দিকে যায়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স