ঢাকা

স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রাখার দাবি বিরোধী দলের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বহাল রাখার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য করার যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি বলেন, দেশে ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক রয়েছেন। অতীতে তাঁরা বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়া ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাঁদের অযোগ্য করার কোনো বিধান গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করে জামায়াতে ইসলামী।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিতভাবে ৯ দফা দাবি জানিয়েছে বলে জানান তিনি। বৈঠকে এসব দাবির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলেও জানান জামায়াতের এই নেতা।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অযোগ্য করার সুপারিশ বাতিলের দাবি

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। তাঁদের ভোটার হিসেবে থাকার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন, অথচ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না—এ ধরনের বিধান বৈষম্যমূলক। তাঁর দাবি, এ ধরনের বিধান সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দেশে ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক রয়েছেন। তাঁরা অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে এবং প্রার্থী হতে পেরেছেন। অথচ এখন তাঁদের স্থানীয় নির্বাচনে অযোগ্য করার সুপারিশ করা হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং সুপারিশটি বাতিলের দাবি করা হয়েছে।

গত ২৯ জুলাই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকেও জামায়াতে ইসলামী একই দাবি জানিয়েছিল বলে জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।

নিষিদ্ধ দলের পদধারীদের প্রার্থিতা নিয়ে আপত্তি

স্থানীয় নির্বাচনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতা বা পদধারীদের অংশগ্রহণের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, যেসব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ, সেসব দলের কোনো নেতা বা পদধারী ব্যক্তি স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিলে সেটিকে রাজনৈতিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তাঁর দাবি, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।

ইসির কর্মকর্তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া শামসুল আলমের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অতীতে শামসুল আলম একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনবিষয়ক কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন তথ্য ও প্রমাণ তাঁদের কাছে রয়েছে। তাঁর দাবি, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো ব্যক্তির নিয়োগ হওয়া উচিত নয়, যার অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, নির্বাচন কমিশনকে তাঁরা এ বিষয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। জবাবে কমিশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সরকারকে জানানো হবে বলে জানানো হয়েছে।

স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও আপত্তি

জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগ নিয়ে তাঁদের আশঙ্কা রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এসব ব্যক্তিরা স্থানীয় নির্বাচনের মাঠ নিজেদের জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ পেতে পারেন। তাই যাঁরা এসব স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।

দলটির মতে, নির্বাচনের আগে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের প্রার্থিতা নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। এতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করে তারা।

মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারে অংশ না নেওয়ার দাবি

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার দাবিও জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্থানীয় নির্বাচন যাতে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে, সে জন্য ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

তাঁদের দাবি, স্থানীয় নির্বাচনে সব প্রার্থীকে সমান সুযোগ দিতে হলে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

‘এ মুহূর্তে নির্বাচন বর্জনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই মুহূর্তে স্থানীয় নির্বাচন বর্জনের মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তাঁরা এখনো আশাবাদী বলে জানান তিনি।

তবে নির্বাচন কমিশনের ওপর দলীয় সরকারের চাপ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কমিশনের কথাবার্তা ও আচরণ থেকে তাঁদের মধ্যে কিছুটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী চায় নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করুক। একই সঙ্গে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা এবং কমিশনকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে নয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয় না। ফলে জামায়াতের পক্ষ থেকে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

তবে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দলের শাখাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও মনোনয়নের কাজও স্থানীয় পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

তিনি আরও জানান, ১১-দলীয় রাজনৈতিক ঐক্য জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিটি দল নিজস্বভাবে প্রার্থী দিতে পারবে।

অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনে জোটগত সমঝোতা থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনী প্রস্তুতি নেবে বলে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলের বৈঠক

মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন ভবনে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠক করে।

প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ, আবদুর রব ও মোবারক হোসাইন, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান (মোমেন) এবং কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ইয়াছিন আরাফাত।

বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা, নির্বাচনী পরিবেশ, প্রশাসনিক প্রভাব, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং স্থানীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিতভাবে ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করেছে। এসব দাবি নিয়ে কমিশনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য শোনা হয়েছে।

অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় জামায়াত

জামায়াতের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যে স্থানীয় নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়—এমন সিদ্ধান্ত বা নিয়োগ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতার সুযোগ, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসকদের প্রার্থিতা, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারে অংশগ্রহণ—এসব বিষয়কে দলটি নির্বাচনী পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করছে।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ধারাবাহিক আলোচনা ও দাবিদাওয়া উপস্থাপনের অংশ হিসেবেই জামায়াতে ইসলামীর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই একটি গ্রহণযোগ্য স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স