ঢাকা

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ভীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল: স্পিকার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মাধ্যমে দেশে ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তাঁর ভাষ্য, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতা-কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিপীড়ন, নির্যাতন, গুম ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপের সাক্ষাৎকালে স্পিকার এসব কথা বলেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ সময় রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার কয়েকজন সংসদ সদস্য তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং স্বজনদের গুম ও নির্যাতনের ঘটনাও তুলে ধরেন।

১৫ বছরের শাসনে গুম-নিপীড়নের আবহ তৈরি: স্পিকার

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের টানা প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠ রোধ করতে বিভিন্ন ধরনের দমনমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

তাঁর অভিযোগ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন বন্দিশালা এবং ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো আইনকে অপপ্রয়োগের মাধ্যমে দেশে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।

স্পিকার বলেন, রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণকারীদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন চালানো, তাঁদের গুম করা এবং হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করেছিল। এর মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকারও সংকুচিত করা হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকদের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়নের ফলে দেশে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশ করতেও ভয় পেতেন।

গুমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন সংসদ সদস্যরা

সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার সংসদ সদস্যরা তাঁদের নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ দেন।

সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি তাঁর ভাই সাজেদুল ইসলামের দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকার ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি তাঁর ভাইয়ের গুমের পর পরিবারের সদস্যদের ওপর নেমে আসা অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ অপেক্ষার কথাও তুলে ধরেন।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম, যিনি ব্যারিস্টার আরমান নামে পরিচিত, এবং হুমাম কাদের চৌধুরী তাঁদের ‘আয়নাঘর’-এ বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তাঁরা সেখানে বন্দি থাকা অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও তুলে ধরেন।

তাঁদের বক্তব্যে রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা এবং গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখার অভিজ্ঞতার বিষয়গুলো উঠে আসে।

ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনা তুলে ধরলেন তাহসিনা রুশদীর লুনা

সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল তাঁর স্বামী বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীর গুমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ‘গুম’ শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে ইলিয়াস আলীকে গুম করেছিল।

লুনা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে যাঁরা গুম, হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশের ঘটনাকে ‘অমানবিক ও জঘন্য’ বললেন আইপিইউ মহাসচিব

সাক্ষাৎকালে আইপিইউ মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের ওপর নিপীড়নের ঘটনাকে অমানবিক ও জঘন্য বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিরোধিতা বা ভিন্নমতের কারণে কাউকে নিপীড়ন, গুম কিংবা হত্যার শিকার হতে হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের শাসনামলের সঙ্গে নিজের দেশ রোমানিয়ার সাবেক শাসক নিকোলায়ে চসেস্কুর দমনমূলক শাসনের কিছু মিল রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আইপিইউ মহাসচিব। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং মানুষের অধিকার সংকুচিত করার মতো বিষয়গুলোর প্রসঙ্গ উঠে আসে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংঘটিত এসব ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে তা আন্তর্জাতিক সংসদীয় পরিসরে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

আইপিইউর গভর্নিং বডিতে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা

বাংলাদেশ সফর শেষে আইপিইউর গভর্নিং বডির কাছে এ দেশের কথিত স্বৈরাচারী শাসনামলে সংঘটিত গুম, হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়ার অভিমত ব্যক্ত করেন অ্যান্ডা ফিলিপ।

তিনি বলেন, সফরকালে পাওয়া তথ্য, রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে বিষয়গুলো আইপিইউর সংশ্লিষ্ট কাঠামোর সামনে তুলে ধরা হবে।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক সংসদীয় অঙ্গনে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের দাবি

সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে অতীতের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনাগুলোর তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি গুরুত্ব পায়।

তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার বিচার শুধু ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয় নয়; ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

স্পিকারও তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের কারণে দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে উঠে আসা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অভিযোগগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আইপিইউ মহাসচিবের বক্তব্য এবং ভবিষ্যতে গভর্নিং বডিতে প্রতিবেদন দেওয়ার সম্ভাবনা এ বিষয়গুলোকে আন্তর্জাতিক সংসদীয় পরিসরেও আলোচনায় আনতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স