ঢাকা

তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার বিকল্প নিয়ে এআইইউবির শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্যোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দেশের নগর ও শহরতলির সড়কে ব্যাপকভাবে চলাচল করা তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব, জ্বালানিসাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আধুনিক যানবাহন ব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি–বাংলাদেশের (এআইইউবি) শিক্ষার্থীরা।

গবেষণায় বৈদ্যুতিক যান বা ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) এবং প্লাগ–ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকল (পিএইচইভি) ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের নগর পরিবহনব্যবস্থার সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এতে পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ কমানো, নিরাপদ চলাচল এবং টেকসই নগর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এআইইউবির আয়োজনে ‘ফ্রম রিসার্চ টু রিয়েলিটি: হাউ উই বিল্ট দ্য ইভি/পিএইচইভি ফিজিবিলিটি প্রজেক্ট’ শীর্ষক গবেষণা ও উদ্ভাবনী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এ গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

নগর পরিবহনে আধুনিক বিকল্পের সন্ধান

বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও নগর এলাকায় তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, ছোট সড়ক ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থায় এসব যান মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে এসব যানবাহনের ব্যবহার ঘিরে নিরাপত্তা, যান চলাচল ব্যবস্থাপনা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা এবং পরিবেশগত প্রভাবসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

এ বাস্তবতায় প্রচলিত ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহনের বিকল্প হিসেবে আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর যানব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা খুঁজে দেখেছে এআইইউবির শিক্ষার্থীদের গবেষণা দল।

গবেষণায় শুধু নতুন যানবাহন তৈরির সম্ভাবনাই বিবেচনা করা হয়নি; বরং বাংলাদেশে এ ধরনের যানবাহন চালু করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহ, চার্জিং ব্যবস্থা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সম্ভাব্যতা যাচাই কেন গুরুত্বপূর্ণ

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কোনো নতুন প্রযুক্তি বা বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ গবেষণা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো প্রযুক্তি কেবল প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেই তা বাস্তবে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায় না। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব, নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ও যুক্ত থাকে।

একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পটি প্রযুক্তিগতভাবে কতটা কার্যকর, বাস্তবায়নে কী ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন, সম্ভাব্য ব্যয় কত এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা কেমন হতে পারে—এসব বিষয়ে একটি বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়।

বক্তারা আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণাকে যদি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে গবেষণার সুফল সরাসরি দেশ ও মানুষের কাজে লাগানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইভি ও পিএইচইভি ব্যবস্থার সম্ভাবনা

গবেষণায় বাংলাদেশের নগর পরিবহনব্যবস্থায় ইভি ও পিএইচইভির সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ইভি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক শক্তিতে পরিচালিত হওয়ায় প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের তুলনায় স্থানীয় পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে পিএইচইভিতে বৈদ্যুতিক মোটর ও প্রচলিত ইঞ্জিন—দুই ধরনের প্রযুক্তির সমন্বয় থাকে। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য শক্তির উৎস ব্যবহারের সুযোগ থাকে।

তবে বাংলাদেশে এ ধরনের যানবাহনের বিস্তৃত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে শুধু যানবাহন উৎপাদন করলেই হবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

গবেষণায় এসব বিষয়কেই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

চার্জিং অবকাঠামো ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা।

গবেষণায় এ কারণে চার্জিং স্টেশন স্থাপন, বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা এবং ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি যানবাহনের নিরাপত্তা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বক্তারা বলেন, নতুন কোনো পরিবহন প্রযুক্তি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হলে সেটি ব্যবহারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহজলভ্য রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া যানবাহনের সামগ্রিক ব্যয় এবং ব্যবহারকারীদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি পরিবেশবান্ধব হলেও সেটি যদি সাধারণ মানুষের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়, তাহলে ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

‘গবেষণা থেকে উদ্ভাবন, উদ্ভাবন থেকে বাস্তবায়ন’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে থ্রিলিফ টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ তাজুল ইসলাম রুমেল বলেন, কোনো ধারণা বাস্তবে প্রয়োগের আগে এর প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক দিক যাচাই করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, গবেষণা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে একটি প্রকল্পের বাস্তব সম্ভাবনা নির্ধারণ করা যায়। তথ্যপ্রযুক্তি ও গবেষণার সমন্বিত ব্যবহার করে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা ও তার কার্যকর সমাধান বের করা সম্ভব।

তিনি তরুণ প্রজন্মকে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

তাঁর বক্তব্যে গবেষণা থেকে উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবনকে বাস্তব প্রয়োগে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প খাতের সহযোগিতার প্রয়োজন

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে থ্রিলিফ টেকনোলজিস লিমিটেডের পরিচালক–আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক উন্নয়ন রন্টি চৌধুরী বলেন, গবেষণার ফলাফলকে বাস্তব প্রয়োগে নিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার সঙ্গে শিল্প খাতের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বাজারসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা যুক্ত করা গেলে বাস্তবমুখী প্রকল্প তৈরি করা সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হলেও তা অনেক সময় বাস্তব উৎপাদন বা বাজারপর্যায়ে পৌঁছায় না। এ ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গবেষণাকে বাস্তব প্রয়োগের পর্যায়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন তৈরি করতেও এ ধরনের অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুষ্ঠানে বক্তারা মত দেন।

শিক্ষার্থীদের গবেষণা কার্যক্রমের স্বীকৃতি

অনুষ্ঠানে এআইইউবি এফবিএ স্টুডেন্ট রিসার্চ গ্রুপের গবেষণা কার্যক্রম এবং বাংলাদেশে ইভি/পিএইচইভি উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে অবদান রাখায় সংশ্লিষ্ট প্রধান অতিথিকে সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা ও সঞ্চালনা করেন এআইইউবির বাণিজ্য গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক ও চিফ ইনভেস্টিগেটর অধ্যাপক মুস্তাফা হাসান।

অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এআইইউবির ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন ও উপদেষ্টা এবং নর্দান ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেন।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন থ্রিলিফ টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ তাজুল ইসলাম রুমেল। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক–আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক উন্নয়ন রন্টি চৌধুরী এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আল–আমরান।

এ ছাড়া এআইইউবির হেড অব এমআইএস ডিপার্টমেন্ট মো. মেজবাউল হক নাহিদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

টেকসই পরিবহনের দিকে এগোনোর সম্ভাবনা

গবেষণাটি মূলত বাংলাদেশের নগর পরিবহনব্যবস্থায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই বিকল্প খুঁজে দেখার উদ্যোগ। তবে কোনো বিকল্প যানবাহন বাস্তবে চালু করতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা থাকাই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অবকাঠামো, নিরাপত্তা, ব্যবহারকারীর গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ উদ্যোগে এ ধরনের গবেষণা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অব্যাহত থাকলে পরিবহন খাতের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য খাতেও বাস্তব সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান তৈরির সুযোগ বাড়বে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে শিল্প খাতের অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগকে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের পরিবহন খাতে আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, জ্বালানিসাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ তৈরি হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স