দেশের জ্বালানি খাতে সংকট এখন একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি করছে। টানা প্রায় নয় বছর ধরে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এর দামও বেড়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে কোনো কোনো দিনে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পরিমাণ বকেয়া। এসব কেন্দ্রের কাছে সরকারের পাওনা প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপও রয়েছে। সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় নিয়মিত বিল পরিশোধ ও জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বেশি দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও বাড়তি চাপ পড়ছে।
সব মিলিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট একক কোনো সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব। তাঁদের যুক্তি, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে প্রয়োজনে কিছু বাড়তি ব্যয় করতে হবে। এতে অর্থনীতির সামগ্রিক কার্যক্রম সচল থাকবে এবং পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্বও বাড়তে পারে।
সামনে গুরুত্বপূর্ণ সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর
নভেম্বর থেকে দেশে তাপমাত্রা কমতে শুরু করলে বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে। তাই আপাতত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—এই দুই মাসই সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের। ব্যবসায়ীদের পরামর্শ, এ সময়ে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি ব্যবহার করা যেতে পারে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে জ্বালানি তেল ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল হতে পারে। একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও এসেছে।
সরকারও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর কথা ভাবছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কেন্দ্রগুলোর নিয়মিত বিল পরিশোধ করে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল সংগ্রহেও কিছুটা জটিলতা রয়েছে।
এলএনজি সরবরাহ কেন কমেছে
বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশি জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হওয়ায় সেই নির্ভরতার নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার অধীন সংস্থা আরপিজিসিএল দেশে এলএনজি আমদানির দায়িত্ব পালন করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৭১টি এলএনজি কার্গো এসেছিল। চলতি বছরে একই সময়ে এসেছে ৬৮টি। বিশেষ করে জুলাই ও আগস্টে গত বছরের তুলনায় তিনটি করে মোট ছয়টি কার্গো কম এসেছে।
এর পাশাপাশি একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১৬ দিন সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে আরও কয়েকটি কার্গোর প্রয়োজন কমে যায়। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে অভিজ্ঞতাহীন একটি কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার কারণেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগস্টে চারটি কার্গো সরবরাহ করার কথা থাকলেও কোম্পানিটি তা দিতে পারেনি।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গরম খুব একটা কমবে না। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এই দুই মাসে অন্তত ২০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা প্রয়োজন হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় চাপ
বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকেও এলএনজি সংগ্রহ করে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক সরবরাহেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের কাতার, ওমান ও মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। এসব সরবরাহের ক্ষেত্রেও কাতারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমেছে। এর প্রভাব বিশ্ববাজারের দামেও পড়েছে।
যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার থেকে মাত্র ১৮টি এলএনজি চালান রপ্তানি হয়েছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল ৫০৯। যুদ্ধের কারণে কাতার সাময়িকভাবে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন ১২টি উৎপাদন ইউনিট আবার চালু করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ইউনিট মেরামতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
দেশে গ্যাসের ঘাটতি তীব্র
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। তবে একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সংকট আরও প্রকট হয়।
গত ৭ আগস্ট ওই টার্মিনাল থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো না আসায় সরবরাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৩৩ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে প্রায় ৭১ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে আটটির ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। চারটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে এবং আরও চারটি খোলাবাজার থেকে কেনা হয়েছে।
খোলাবাজারের কার্গোগুলোর দাম প্রতি ইউনিটে প্রায় ২২ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ৬২ ডলার পর্যন্ত পড়ছে। বাকি দুটি কার্গোর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও একটি দরপত্রে ২৬ ডলারের প্রস্তাব এসেছে এবং অন্যটিতে কোনো প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। পরে দুটি কার্গোর জন্য নতুন করে দরপত্র ডাকা হয়েছে।
তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটা কার্যকর
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির সংকটের কারণে বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো উৎপাদন করা যাচ্ছে। এর ফলেই কোনো কোনো দিনে লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াটেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। দেশে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সর্বশেষ সময়ে উৎপাদন ছিল ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের নিচে। কোথাও কারিগরি ত্রুটি, কোথাও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কোথাও কয়লা সরবরাহের সমস্যার কারণে উৎপাদন কমেছে।
ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন কমেছে। কয়লা সরবরাহে বিঘ্নের কারণে দিনের বেলায় কেন্দ্রটি প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করছে।
তেলচালিত কেন্দ্রেই আপাতত সম্ভাবনা
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো তুলনামূলক ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণত এগুলো সীমিত সময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে বর্তমান এলএনজি বাজারদর বিবেচনায় তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমানে ফার্নেস তেল ব্যবহার করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২১ টাকা ৫১ পয়সা। অন্যদিকে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ২৪ ডলার ধরে হিসাব করলে তা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের খরচ ২৩ টাকার বেশি হতে পারে।
তবে এলএনজি ও ফার্নেস তেলের আমদানিতে করের হার এক নয়। এলএনজিতে শুল্ক প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, আর ফার্নেস তেলে শুল্ক-কর মিলিয়ে প্রায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এলএনজির ওপরও তেলের মতো কর আরোপ করা হলে এর মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের খরচ আরও বেড়ে ২৬ টাকার বেশি হতে পারে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের মতে, সাময়িকভাবে ফার্নেস তেলের শুল্ক প্রত্যাহার করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ প্রতি ইউনিটে প্রায় ১৭ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করলে তারা প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে পারবে।
লোডশেডিং কমানোর সুযোগ রয়েছে
তেলচালিত কেন্দ্রগুলো যদি প্রায় ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানো যায়, তাহলে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকেও আরও প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
এই দুই উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানো গেলে বর্তমান লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এমনকি কোথাও লোডশেডিং হলেও তা সহনীয় পর্যায়ে রাখা যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই স্থায়ী সমাধান
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, নভেম্বর থেকে শীত শুরু হলে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমবে। ফলে সরকার কয়েক মাস তুলনামূলক স্বস্তিতে থাকতে পারবে। কিন্তু সেই সময়টিকে পরবর্তী গ্রীষ্মের প্রস্তুতির জন্য কাজে লাগাতে হবে।
মধ্যমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে, এলএনজির দাম এখন অনেক বেশি এবং এটি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তারপরও প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হবে। তবে আগের মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ সম্ভব নাও হতে পারে। তাই অগ্রাধিকার অনুযায়ী গ্যাস বিতরণ করতে হবে এবং একই সঙ্গে তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়াতে হবে।