ঢাকা

প্রাথমিকের নতুন শিক্ষাক্রমে ১২ জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বইনির্ভর জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখাতে শিক্ষাক্রমে বছরজুড়ে ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় বা থিমকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। নিরাপত্তা, জীবনদক্ষতা, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা বাস্তব বিষয়কে এসব থিমের আওতায় আনা হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়; বরং তাদের নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থী শুধু বইয়ের জ্ঞান অর্জন করবে না; বরং কীভাবে নিরাপদ থাকতে হয়, কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে জীবন পরিচালনা করতে হয় ও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেকে সামলাতে হয়, সেসব বাস্তব জীবনদক্ষতাও শিখবে।’

বুধবার ঢাকার একটি হোটেলে হেইলিবারি ভালুকা ও কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্টের যৌথ আয়োজনে ‘সেফগার্ডিং লিডারশিপ সামিট’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পরে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর বক্তব্যের বিষয়গুলো জানানো হয়। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল—‘স্ট্রংগার টুগেদার, সেফার টুমরো—কিপিং চিলড্রেন সেফ ইন বাংলাদেশ’।

১২ মাসে ১২টি থিম

প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন করে প্রাথমিক শিক্ষাক্রম সংস্কারের কাজ চলছে। সংস্কার করা শিক্ষাক্রমে ১২ মাসে ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ থিম নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বছরের প্রতিটি মাসে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং সেই থিমকে অন্যান্য বিষয়ের পাঠের সঙ্গেও যুক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, কোনো একটি মাসে যে বিষয়টিকে থিম হিসেবে নির্ধারণ করা হবে, ওই মাসে বিভিন্ন বিষয়ের পাঠে সেই বিষয়টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদাহরণ, সংখ্যা, প্রশ্ন ও আলোচনা যুক্ত করা হবে। এতে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক সহজে বুঝতে পারবে।

এর ফলে একটি নির্দিষ্ট বিষয় শুধু আলাদা কোনো পাঠ বা আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং বাংলা, গণিতসহ বিভিন্ন বিষয়ের শেখার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একই বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা তৈরি হবে।

পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ

উদাহরণ হিসেবে অগ্নিনিরাপত্তার কথা উল্লেখ করেন ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, কোনো মাসে অগ্নিনিরাপত্তাকে থিম হিসেবে নির্ধারণ করা হলে গণিতের পাঠে অগ্নিকাণ্ডসংক্রান্ত সংখ্যা বা সমস্যা, ভাষার পাঠে অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক লেখা কিংবা অন্যান্য বিষয়ে এ-সংক্রান্ত উদাহরণ ও আলোচনা যুক্ত করা যেতে পারে।

একইভাবে পর্যায়ক্রমে সড়ক নিরাপত্তা, পানিতে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা, দুর্যোগ মোকাবিলাসহ শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের কাছে জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলোকে সহজ ও ব্যবহারিকভাবে তুলে ধরা। এতে বিদ্যালয়ে শেখা জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে।

নিরাপদ বিদ্যালয় পরিবেশের ওপর গুরুত্ব

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভিশন অনুযায়ী এমন একটি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি, যেখানে প্রতিটি শিশু নিরাপদ পরিবেশে বিদ্যালয়ে আসবে এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকরভাবে শেখার সুযোগ পাবে।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জীবনদক্ষতা শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশের সব ধরনের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে সরকার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ যাতে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক হয়, তা নিশ্চিত করাও এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একাডেমিক ফলাফলের বাইরে শিশুর নিরাপত্তা

সম্মেলনের শুরুতে বক্তব্য দেন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্টের কান্ট্রি লিড সারওয়াত রেজা। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের উৎকর্ষের ধারণাকে শুধু একাডেমিক ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুস্থতার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।

তাঁর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে তাদের সার্বিক কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

অন্যদিকে হেইলিবারি ভালুকার ফাউন্ডিং হেডমাস্টার সাইমন ও’গ্রেডি শিশুদের সুরক্ষা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশসংক্রান্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।

তিনি শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর শৃঙ্খলাবিধান, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের হার কমে যাওয়া, অভিযোগ না জানানোর প্রবণতা এবং কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

এসব বিষয় বিদ্যালয়ে শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের দিকটি সামনে আনে। বিশেষ করে কোনো ধরনের নির্যাতন, হয়রানি বা অনিরাপদ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে শিক্ষার্থীরা যাতে বিষয়টি জানাতে পারে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়, সে জন্য বিদ্যালয়ের পরিবেশকে আরও সহায়ক করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ

সেফগার্ডিং লিডারশিপ সামিটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিশুদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে ১২টি জীবনঘনিষ্ঠ থিম যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে শিশুদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আরও সরাসরি সংযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে বয়স উপযোগী ধারণা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজসহ শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স