ঢাকা

পোশাকশিল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বিজিএমইএর মতবিনিময়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকট নিয়ে মতবিনিময় করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) নেতারা। বৈঠকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ও রপ্তানি পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর তৈরি পোশাক খাতের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের বিষয়টি জানানো হয়।

বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকটের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, দেশের প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং প্রায় ৩ হাজার উদ্যোক্তা সরাসরি এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিল্পের কার্যক্রম ও রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানান তাঁরা।

একই সঙ্গে পোশাক রপ্তানি আয়কে বর্তমান পর্যায় থেকে ভবিষ্যতে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথাও বিরোধীদলীয় নেতার কাছে তুলে ধরেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা।

উৎপাদন ও রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ

বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের বড় একটি অংশ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখা জরুরি।

তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে একদিকে যেমন কারখানার পরিচালন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে যেসব নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, সেগুলো নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।

বিজিএমইএ নেতারা পোশাকশিল্পের এসব সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

‘সংকটের কথা আন্তরিকতার সঙ্গে শুনেছেন’

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার কাছে পোশাকশিল্পের চলমান বিভিন্ন সংকট তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে এসব সমস্যা শুনেছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।

সংকট উত্তরণে বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলেও জানান বিজিএমইএ সভাপতি।

তিনি বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় বাড়ানোর যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিও কাজে লাগাতে নীতিগত সহায়তা দরকার।

জ্বালানি সংকটে সহযোগিতার প্রস্তাব জামায়াতের

বৈঠকের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বিজিএমইএর নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের অবদান রাখছে, বর্তমানে খাতটি কী কী সমস্যার মুখোমুখি, এর সম্ভাবনা কোথায় এবং এসব সমস্যা সমাধানে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয়ে বিজিএমইএ নেতাদের কাছ থেকে ধারণা নেওয়াই ছিল মতবিনিময় সভার মূল উদ্দেশ্য।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের স্বার্থে ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা থাকা উচিত। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট সমাধানে প্রয়োজন হলে জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সরকারকে কারিগরি ও নীতিগত সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো খাতের সমস্যা সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা থাকলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

একই সঙ্গে সংসদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথে জনগণের ন্যায্য দাবির পক্ষে থাকার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন জামায়াতের এই নেতা।

পোশাক রপ্তানিতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা

বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা পোশাক রপ্তানি আয় ভবিষ্যতে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, অর্থায়নের ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে আলোচনায় উঠে আসে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা, শুল্ক, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আসতে পারে, সেগুলোও পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।

বৈঠকে যারা ছিলেন

মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, মোবারক হোসাইন, নূরুল ইসলাম বুলবুল, শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও রেজাউল করিম এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আতিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বিজিএমইএর প্রতিনিধিদলে সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সেলিম রহমান, সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম, মিজানুর রহমান, বিদিয়া অমৃত খান, শেহাব উদ্দুজা চৌধুরী ও মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী। এ ছাড়া বিজিএমইএর বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালকেরাও সভায় অংশ নেন।

বৈঠকে তৈরি পোশাকশিল্পের তাৎক্ষণিক সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হওয়ায় শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স