ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের বইয়ের বর্ণনা
একাত্তরে ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। দলের ভেতরে একাধিকবার এ নিয়ে খসড়া তৈরি হয়েছে, জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠক হয়েছে, এমনকি কোনো কোনো পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগই বাস্তবায়িত হয়নি।
কখনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান বদলেছে, কখনো ওয়ার্কিং কমিটি বা অন্য কোনো সাংগঠনিক স্তরে বিরোধিতা এসেছে, আবার কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরামর্শে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হয়েছে—এমনই একটি ধারাবাহিক বর্ণনা দিয়েছেন জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক।
তাঁর লেখা Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics বইয়ের ‘Reform Agenda Within Jamaat’ অধ্যায়ে জামায়াতের ভেতরে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক, ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ এবং শেষ পর্যন্ত দল বিলুপ্ত করে নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসার ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বইটি গত মাসে প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে একপর্যায়ে জামায়াতের নির্বাহী কমিটি একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা, দল বিলুপ্ত এবং নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। এর পরপরই দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন আবদুর রাজ্জাক।
জামায়াতে রাজ্জাকের দীর্ঘ পথ
আবদুর রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে রুকন হন এবং ১৯৯১ সালের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য হন। ২০০৩ সালে তাঁকে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল করা হয়।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের কয়েকজন নেতার পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় আর দেশে ফেরেননি। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তিনি চিকিৎসাধীনও ছিলেন।
একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে দলের ভেতরে একটি স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার কথা বইয়ে লিখেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন রাজ্জাক। পরে আত্মপ্রকাশ করা এবি পার্টির প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফেরার পর ২০২৫ সালের ৪ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো—জামায়াতের ভেতরে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে পরিবর্তনের যে উদ্যোগগুলো বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো কেন বাস্তবায়িত হয়নি, তার বিবরণ।
গোলাম আযমের ‘দায়সারা’ ক্ষমা প্রার্থনা
জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার অন্যতম পুরোনো উদ্যোগের কথা এসেছে ১৯৯৩-৯৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে।
বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ২২ জুন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রায় এক বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ৪ জুলাই, তৎকালীন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান নিজামীকে চিঠি দিয়েছিলেন আবদুর রাজ্জাক।
নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে গোলাম আযম যেন একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন, সে পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ২৪ জুন ঢাকার বায়তুল মোকাররমে বিজয় সমাবেশ হয়। গোলাম আযমের বক্তব্য প্রস্তুতের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। রাজ্জাকের স্মৃতিতে, তিনিও ওই কমিটির সদস্য ছিলেন।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, গোলাম আযমকে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। রাজ্জাক মনে করেছিলেন, দৃঢ়ভাবে ক্ষমা চাওয়া হলে সেটিকে আন্তরিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারত এবং একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনারও অবসান ঘটানোর সুযোগ তৈরি হতো।
গোলাম আযম নীতিগতভাবে এ প্রস্তাবে সম্মতও হয়েছিলেন বলে লিখেছেন রাজ্জাক।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাবেশে তিনি বলেন, ‘অতীতে যদি আমি কোনো ভুল করে থাকি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন।’
রাজ্জাকের মূল্যায়ন, গণমাধ্যমে বক্তব্যটি তেমন গুরুত্ব পায়নি। তাঁর মতে, এটি বড়জোর দায়সারা ক্ষমা প্রার্থনা ছিল; প্রকৃত অর্থে ক্ষমা চাওয়া নয়। তাঁর ভাষায়, গুরুতর একটি বিষয় মোকাবিলার এটি ছিল অসংলগ্ন চেষ্টা।
২০০১ সালে নতুন করে উদ্যোগ
এর প্রায় এক দশক পর আবারও বিষয়টি সামনে আসে। ২০০১ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোটের নির্বাচনী বিজয়কে একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন আবদুর রাজ্জাক।
ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই দলের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি।
রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, বিবৃতির খসড়া তৈরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপক—আফতাব আহমেদ, এম মাহবুবউল্লাহ ও আবদুর রবের সহযোগিতা নেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহের চেষ্টায় খসড়াটি তৈরি হয়।
খসড়ায় অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে জামায়াতের ঐতিহাসিক অবস্থানের ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন বিভিন্ন বর্বরতায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল।
খসড়ার অনুমোদন নিয়ে প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী। উপস্থিত ছিলেন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও এ টি এম আজহারুল ইসলাম। পরে মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।
ছয় বৈঠক, সাতের বেশি খসড়া
বইয়ে রাজ্জাক লিখেছেন, উপকমিটি অন্তত ছয়বার বৈঠক করেছিল। বিজয় দিবসের আগে সংবাদ সম্মেলন করে বিবৃতি দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্তও হয়েছিল।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে আগ্রহী ছিলেন। তবে এ টি এম আজহারুল ইসলামের আপত্তি ছিল। একপর্যায়ে একটি বৈঠকে মুজাহিদ তাঁকে এ নিয়ে ভর্ৎসনাও করেন। পরে আজহারুল ইসলাম আপত্তি থেকে সরে আসেন।
খসড়াটি তৈরির সময় প্রতিটি শব্দ ও বাক্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা হয়েছিল বলে লিখেছেন রাজ্জাক। তাঁর স্মরণে, সাতটির বেশি খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত একটি বিবৃতি নিয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়।
কিন্তু তখনই নতুন জটিলতা দেখা দেয়।
রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর মুজাহিদ তাঁকে জানান, দলের একজন প্রবীণের পরামর্শে নিজামী হয়তো ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান বদলে ফেলেছেন। মুজাহিদ ওই প্রবীণের নাম বলেননি। রাজ্জাকও তা জানতে চাননি।
১৬ ডিসেম্বর চলে গেলেও বিবৃতিটি আর প্রকাশ করা হয়নি। রাজ্জাক আশা করেছিলেন, ২০০২ সালের ২৬ মার্চের আগে হয়তো উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হবে। সেটিও হয়নি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিজামী কেন অবস্থান পরিবর্তন করেছিলেন, সে ব্যাখ্যাও দেননি। বরং বিষয়টি দলের ৩৫ থেকে ৪০ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটিতে তোলার কথা বলেন।
চার বছর পর ওয়ার্কিং কমিটিতে
খসড়া তৈরির প্রায় চার বছর পর, ২০০৫ সালের অক্টোবরে, একাত্তরের বিষয়টি ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ওঠে।
রাজ্জাক বইয়ে লিখেছেন, সেখানে তিনি যুক্তি দেন—কোনো দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা একটি দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, এমন নজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই। বাংলাদেশে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জামায়াতকে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে একাত্তরের ভূমিকার বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে।
কিন্তু তাঁর প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রত্যাখ্যাত হয়।
রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, বিরোধিতা এতটাই প্রবল ছিল যে তাঁর প্রস্তাবের সমর্থকেরাও শেষ পর্যন্ত নীরব হয়ে যান।
বিরোধিতাকারীদের যুক্তিও তিনি বইয়ে তুলে ধরেছেন। কেউ বলেছিলেন, জামায়াত মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে ছিল এবং এতে ভুল কিছু ছিল না। কেউ বলেছিলেন, ভারতের আধিপত্যের আশঙ্কা থেকেই সে সময় ওই অবস্থান নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী ইতিহাস তাঁদের অবস্থানের যথার্থতা প্রমাণ করেছে।
আবার কারও যুক্তি ছিল, জামায়াত ক্ষমা চাইলেও আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা সেটি গ্রহণ করবে না।
‘পাকিস্তান অসন্তুষ্ট হবে’
ওয়ার্কিং কমিটির আলোচনায় দুই জ্যেষ্ঠ সদস্যের বক্তব্য তাঁকে বিশেষভাবে বিচলিত করেছিল বলে লিখেছেন রাজ্জাক।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সাবেক এক সংসদ সদস্য বলেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমা চাইলে পাকিস্তান আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হবে।’
জামায়াতের শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন প্রধানও বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নেন। রাজ্জাকের বইয়ে তাঁর বক্তব্যের সারাংশ হলো, একাত্তরের বিষয়টি বছরে দুবার—মার্চ ও ডিসেম্বরে—আলোচনায় আসে, পরে আবার তা মিলিয়ে যায়। ফলে এ নিয়ে ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচনা করা সময়ের অপচয়।
পাকিস্তান অসন্তুষ্ট হওয়ার এই যুক্তি সম্পর্কেও নিজের মূল্যায়ন দিয়েছেন রাজ্জাক। তাঁর লেখা অনুযায়ী, পরবর্তী ঘটনাবলি তাঁকে নিশ্চিত করেছিল যে এ ধরনের আশঙ্কার ভিত্তি যথেষ্ট ছিল না।
২০০৫ থেকে ২০১০: আলোচনা হয়েছে, সিদ্ধান্ত হয়নি
২০০৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১০ সালের জুনে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার আগপর্যন্ত দলের ওয়ার্কিং কমিটি ও নির্বাহী কমিটিতে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয় বলে বইয়ে উল্লেখ করেছেন রাজ্জাক।
কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বারবার প্রশ্ন তুলতেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন করা জামায়াতের জন্য রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সঠিক ছিল কি না। তাঁর অবস্থান ছিল—যদি দল মনে করে ওই অবস্থান সঠিক ছিল, তাহলে সেটি প্রকাশ্যে বলা উচিত। আর যদি সেটি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া উচিত।
রাজ্জাকের মতে, একাত্তরের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ার কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতের নেতৃত্বকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বড় বিজয়ের পর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার ও দণ্ড কার্যকর হয়।
তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান
বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে জামায়াতের মজলিশে শুরার সর্বশেষ উন্মুক্ত অধিবেশন হয়েছিল ২০১১ সালের জুলাইয়ে, মগবাজারের আল-ফালাহ ভবনে।
সেখানেও একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দেন রাজ্জাক। বিশেষ করে দলের তরুণ সদস্যদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অধিবেশনে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্যোগ না নিয়েও যদি দলের দুই নেতার গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানো যায়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
রাজ্জাক এই অবস্থানকে একাত্তরের মতো একটি গুরুতর বিষয় মোকাবিলার যথাযথ পন্থা মনে করেননি।
২০১৬ সালে আবারও ক্ষমার খসড়া
২০১৬ সালে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। নতুন আমির নির্বাচিত হওয়ার পর আবারও একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আলোচনা শুরু হয়।
রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, এ জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। দলের সেক্রেটারি জেনারেল তাঁকে একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করতে বলেন।
কয়েকজন ঘনিষ্ঠজন এবং জামায়াতের তৎকালীন বিদেশি আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের সহযোগিতায় রাজ্জাক একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া তৈরি করেন।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই খসড়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে এবং রাষ্ট্র ও দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে জড়ায়নি—এমন বক্তব্যও ছিল।
পাশাপাশি দল বা এর নেতা-সদস্যদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল।
২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর আমিরকে ব্যক্তিগত চিঠি লিখে এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন রাজ্জাক। কমিটির সদস্যদের কাছেও চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়।
কিন্তু এবারও উদ্যোগটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৯ সালে দল বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত
২০১৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের পর জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আবদুর রাজ্জাকের পরামর্শ চান বলে বইয়ে উল্লেখ করেছেন রাজ্জাক।
ওই সময় তিনি জানতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে জামায়াতের আইনজীবীরা দলকে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সময়ে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারে—এমন খবরও দলের মধ্যে আলোচনায় ছিল।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দলের নির্বাহী কমিটির জরুরি বৈঠক হয়। রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই বৈঠকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—জামায়াত একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা করবে, নিজেদের বিলুপ্ত করবে এবং পরে একটি নতুন দল গঠন করবে।
এরপর সেক্রেটারি জেনারেল তাঁকে দুটি খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেন—একটি ক্ষমা প্রার্থনার বিবৃতি এবং অন্যটি দল বিলুপ্তির প্রস্তাব।
ক্ষমা চাওয়ার খসড়া আগে থেকেই থাকায় তিনি আইনজীবী দলের সহায়তায় দ্রুত দল বিলুপ্তির প্রস্তাব তৈরি করেন।
সদস্যদের মতামতও নেওয়া হয়েছিল
রাজ্জাক লিখেছেন, এরপর মজলিশে শুরার সদস্যদের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ৩০০ সদস্যের নিয়মিত অধিবেশন করা সম্ভব হয়নি। তাই ছোট ছোট দলে বৈঠক করে সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ সদস্যের মতামত নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে জানানো হয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দল বিলুপ্তির পক্ষে মত দিয়েছেন এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে ছিলেন।
কিন্তু এরপরই পরিস্থিতি বদলে যায়।
রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি জামায়াত নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবিত বিল মন্ত্রিসভায় ওঠেনি। এর পর নির্বাহী কমিটির বৈঠকে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেওয়া হয়।
সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, জামায়াত ক্ষমা চাইবে না এবং দলও বিলুপ্ত করবে না।
এই সিদ্ধান্তের পরই রাজ্জাক দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র পাঠান।
কেন বারবার থেমে গেল উদ্যোগ
আবদুর রাজ্জাকের বইয়ের বর্ণনা থেকে দেখা যায়, জামায়াতের ভেতরে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে অবস্থান পরিবর্তনের আলোচনা একবারের ঘটনা ছিল না। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কখনো দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে, কখনো খসড়া তৈরি হয়েছে, কখনো উপকমিটি গঠন করে একাধিক বৈঠক হয়েছে, এমনকি কোনো কোনো পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগই প্রকাশ্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি।
রাজ্জাকের ব্যাখ্যায়, এর পেছনে দলের ভেতরের মতপার্থক্য, নেতৃত্বের অবস্থান পরিবর্তন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২০১৯ সালের ঘটনাটি ছিল এ ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। কারণ এবার শুধু ক্ষমা চাওয়ার নয়, দল বিলুপ্ত করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি।
‘সবচেয়ে বড় দুর্বলতা’ একাত্তরের ভূমিকা
বইয়ের শেষাংশে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে নিজের মূল্যায়নও দিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক।
তিনি লিখেছেন, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই দশকে একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের জন্য অর্ধডজনের বেশি বিবৃতি তৈরিতে তিনি সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার নিয়েও বইয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। রাজ্জাকের মতে, শফিকুর রহমান গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণভাবে দিয়েছেন। তবে দলের পূর্বসূরিদের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বর্তমান নেতৃত্বের সুস্পষ্ট নীতি না থাকায় তাঁর বক্তব্যকে রাজ্জাক বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি।
সবশেষে তিনি লিখেছেন, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা এখনো দলটির ‘সবচেয়ে বড় দুর্বলতা’।
তাঁর বইয়ের এই দীর্ঘ বর্ণনায় মূলত উঠে এসেছে—একাত্তরের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জামায়াতের ভেতরে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা বারবার সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের স্তরে এসে থেমে গেছে। ২০১৯ সালে এসে সেই পরিবর্তনের উদ্যোগ দল বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত পর্যন্ত পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।