ঢাকা

হামলার ঘটনায় বিএনপিকে দায়ী করে নাহিদের প্রশ্ন—‘কতটা ভয় পেলে এতটা উন্মাদ হতে পারে’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। রোববার সন্ধ্যায় তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ এবং তাঁর ব্যবহৃত গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

এ ঘটনায় বিএনপিকে দায়ী করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি দাবি করেছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর পাটওয়ারীর ওপর এটি পঞ্চম হামলার ঘটনা। তবে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ছাত্রদল এ ধরনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না এবং ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

লালন আখড়াবাড়িতে কী ঘটেছিল

এনসিপি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, ব্যক্তিগত সফরে রোববার কুষ্টিয়ায় যান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রথমে তিনি কুমারখালীর শিলাইদহে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি পরিদর্শন করেন। পরে সন্ধ্যায় ছেঁউড়িয়ার লালন শাহের আখড়াবাড়িতে যান।

সেখানে মাজার পরিদর্শনের পর স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় গান শোনেন এবং ফেসবুকে লাইভ করেন। অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয় বলে তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন। এরপর ২০ থেকে ২৫ জন যুবক সেখানে জড়ো হয়ে তাঁকে গালাগাল করেন এবং মারধরের জন্য তেড়ে আসেন বলেও তাঁদের দাবি।

পাটওয়ারীকে রক্ষায় তাঁর সঙ্গে থাকা এনসিপির নেতা-কর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। এ সময় কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। একপর্যায়ে আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের সামনে রাখা পাটওয়ারীর গাড়িতে ইট নিক্ষেপ করা হয় এবং গাড়ির কাচ ভাঙচুর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটে।

ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য মাজার প্রাঙ্গণে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পাটওয়ারীকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলামও হামলার ঘটনা ঘটার কথা জানিয়েছেন। তবে সে সময় গাড়ি ভাঙচুরের বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

বিএনপিকে দায়ী করে নাহিদের বক্তব্য

ঘটনার পর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রতিক্রিয়া জানান নাহিদ ইসলাম। হামলার জন্য বিএনপিকে দায়ী করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন নেতাকে কতটা ভয় পেলে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা এমন আচরণ করতে পারেন।

পাটওয়ারীর ভাঙচুর করা গাড়ির কয়েকটি ছবি পোস্ট করে নাহিদ বলেন, তাঁর ওপর আবারও হামলা হয়েছে এবং বিএনপি সরকার গঠনের পর এটি তাঁর ওপর পঞ্চম হামলার ঘটনা। হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।

নাহিদ আরও বলেন, ভয়ভীতি বা দমন-পীড়ন চালিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাবে না।

এনসিপির আরও কয়েকজন নেতাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁদের পোস্টেও হামলার জন্য বিএনপির নেতা-কর্মীদের দায়ী করা হয়েছে।

ছাত্রদলের অস্বীকার

তবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার সঙ্গে ছাত্রদলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বী।

তিনি বলেছেন, পাটওয়ারীর ওপর হামলা হয়ে থাকলে সেটি অবশ্যই নিন্দনীয়। ছাত্রদল ‘মব কালচারের’ রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না এবং এ ঘটনার সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে সংগঠনের কোনো নেতা বা কর্মী এতে জড়িত থাকলে তাঁর ব্যক্তিগত দায় থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকেও কুষ্টিয়ার ঘটনায় দলের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে কুষ্টিয়া বিএনপির নেতা-কর্মীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ফলে হামলার প্রকৃত দায় কার—এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

এনসিপির নিন্দা ও তদন্তের দাবি

ঘটনার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ধারাবাহিক হামলার অভিযোগ তুলে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে এনসিপি। দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতার ওপর বারবার হামলা, হেনস্তা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশের লক্ষণ নয়।

এনসিপির বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু তার জবাব হামলা, ভয়ভীতি বা সহিংসতার মাধ্যমে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে পাটওয়ারীর ওপর একের পর এক হামলার অভিযোগের পুনরাবৃত্তি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও দলটি উল্লেখ করেছে।

দলটি কুষ্টিয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে পাটওয়ারী ও তাঁর সঙ্গে থাকা নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি।

তদন্তের দাবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে পাটওয়ারী ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের তাড়া করতে দেখা যায় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওর সত্যতা এবং ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে ঘটনার পর এনসিপির নেতা-কর্মীরা মামলা করার উদ্যোগ নেন বলেও প্রতিবেদন এসেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলা করতে গিয়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়ে তাঁরা মামলা না করেই কুমারখালী থানা থেকে চলে যান। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরবর্তী বক্তব্য ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন

একজন রাজনৈতিক নেতার ওপর প্রকাশ্য স্থানে হামলা, গাড়ি ভাঙচুর কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কোনো ঘটনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে পরস্পরকে দায়ী করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

কুষ্টিয়ার এ ঘটনার ক্ষেত্রে একদিকে এনসিপি ও দলটির নেতারা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দায়ী করছেন, অন্যদিকে ছাত্রদল ও বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের ওপরই এখন গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

এনসিপি বলেছে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন সহিংসতায় রূপ না নেয় এবং নাগরিকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে—এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের বলেও দলটি উল্লেখ করেছে।

কুষ্টিয়ার লালন আখড়াবাড়িতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগের পর এখন ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, হামলার পেছনে কী কারণ ছিল এবং অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে—সেদিকেই নজর রয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স