এএফপি
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের আকস্মিক কিয়েভ সফরের মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানীতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। স্থানীয় সময় রোববার মের্ৎস কিয়েভে পৌঁছানোর পরপরই শহরজুড়ে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজতে শুরু করে। এ সময় রুশ ড্রোন হামলার আশঙ্কায় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
হামলার সময় কিয়েভের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি—নর্দান ব্রিজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শহরের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো। নিপ্রো নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটি কিয়েভের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপন করে।
মের্ৎসের সফরের সময় রাজধানীতে এই হামলা ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমা সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা আরও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মের্ৎস কিয়েভে পৌঁছানোর পরই সাইরেন
কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে রোববার কিয়েভে পৌঁছান জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। তবে তিনি শহরে পৌঁছানোর পরপরই রুশ ড্রোন হামলার সতর্কতা জারি হয়।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এর কিছুক্ষণ পর কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানান, রুশ হামলায় নর্দান ব্রিজের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতুটির ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।
নর্দান ব্রিজ নিপ্রো নদীর ওপর নির্মিত কিয়েভের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো। সেতুটি রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে যান চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে এটির ক্ষয়ক্ষতি শহরের যোগাযোগব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সেতুতে হামলার ছবি ছড়িয়ে পড়ে
হামলার পর বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপের চ্যানেলে সেতুটির ক্ষয়ক্ষতির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এসব ছবিতে সেতুর ওপর আঘাত এবং সেখান থেকে আগুনের শিখা উঠতে দেখা যায়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ছবি ও ভিডিওর সবগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে সাম্প্রতিক সময়ে রুশ হামলার মাত্রা বেড়েছে। আবাসিক এলাকা ছাড়াও জ্বালানি স্টেশন, স্কুল, রেলপথ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নিপ্রো নদীর ওপর নির্মিত অন্যান্য সেতুতেও সাম্প্রতিক সময়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে ইউক্রেনের রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
‘রাশিয়াকে থামাতে হবে’
কিয়েভ সফরের সময় জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনকে সবার সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন। রাশিয়াকে থামানো না গেলে একসময় তাদের যুদ্ধযন্ত্র ইউরোপের অন্য দেশগুলোর দিকেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মের্ৎসের এই বক্তব্য থেকে ইউক্রেন যুদ্ধকে শুধু দুই দেশের সংঘাত হিসেবে নয়, ইউরোপের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত একটি বড় সংকট হিসেবে দেখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
জার্মানি ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা সমর্থক। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে বার্লিন কিয়েভকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
আরও সামরিক সহায়তা চাইলেন জেলেনস্কি
মের্ৎসের সফরের সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আরও সামরিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষ করে রাশিয়ার নতুন ধরনের দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন মোকাবিলায় উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চেয়েছেন তিনি। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে হামলার ধরন পরিবর্তন করছে। ফলে আগের প্রতিরোধব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ও অস্ত্রের প্রয়োজন হচ্ছে।
জেলেনস্কির সঙ্গে মের্ৎসের বৈঠকে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং রাশিয়ার ড্রোন হামলা মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে।
১০০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তার সম্ভাবনা
জার্মান সরকারি সূত্র জানিয়েছে, মের্ৎসের সফরের সময় ইউক্রেনের জন্য ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের একটি নতুন সামরিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হতে পারে।
জার্মান সূত্র অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই সহায়তা প্যাকেজে ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাশিয়ার ড্রোন উৎক্ষেপণস্থল শনাক্ত এবং সেগুলোতে হামলা চালানোর সক্ষমতা বাড়াতে ইউক্রেনকে সহায়তা করা হতে পারে।
এ ছাড়া জেটচালিত ড্রোন তৈরিতে জার্মানি ও ইউক্রেনের মধ্যে যৌথ উদ্যোগের বিষয়টিও সহায়তা প্যাকেজে থাকতে পারে।
জার্মানির একটি সরকারি সূত্রের ভাষ্য, নতুন সহায়তা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বর্তমান ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখবে। এর প্রভাব তুলনামূলক দ্রুত দৃশ্যমান হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
ড্রোন যুদ্ধের নতুন পর্যায়
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন হামলা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই পক্ষই আকাশপথে নজরদারি ও হামলার জন্য বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করছে।
রাশিয়ার জেটচালিত দ্রুতগতির ড্রোন ব্যবহারের ফলে ইউক্রেনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে কিয়েভের কর্মকর্তারা মনে করছেন। প্রচলিত ড্রোনের তুলনায় দ্রুতগতির এসব অস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন শুধু আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রতিরোধব্যবস্থা নয়, শত্রুপক্ষের ড্রোন উৎক্ষেপণস্থল শনাক্ত করার জন্য স্যাটেলাইট ও গোয়েন্দা প্রযুক্তির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
জার্মানির সম্ভাব্য নতুন সহায়তা প্যাকেজে এসব প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি তাই ইউক্রেনের যুদ্ধকৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কূটনৈতিক সফরের মধ্যেই হামলা
মের্ৎসের কিয়েভ সফর এমন সময়ে হলো, যখন ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আরও সামরিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে। একই সময়ে রাশিয়ার হামলা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও আঘাত হানছে।
চ্যান্সেলরের সফরের সময়ই নর্দান ব্রিজে হামলার ঘটনা কিয়েভের জন্য প্রতীকীভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পশ্চিমা কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতার সফরের সময় রাশিয়ার হামলা ইউক্রেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
মের্ৎসের বক্তব্যে ইউরোপীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্পর্কের বিষয়টি যেমন উঠে এসেছে, তেমনি জেলেনস্কির সামরিক সহায়তার আবেদনও দেখিয়েছে যে কিয়েভ এখনো রাশিয়ার আকাশ হামলা মোকাবিলায় পশ্চিমা সহযোগিতার ওপর বড়ভাবে নির্ভরশীল।
এখন মের্ৎস ও জেলেনস্কির বৈঠকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে এবং জার্মানি নতুন সামরিক সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা দেয় কি না, সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে কিয়েভের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে রুশ হামলা অব্যাহত থাকে কি না, সেটিও ইউক্রেনের রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।