ঢাকা

কোয়েল মল্লিককে রাজ্যসভায় প্রার্থী করল বিজেপি, ছেড়েছেন তৃণমূল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের আলোচনায় অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক। তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়নে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই দল ছাড়ার পর এবার ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) টিকিটে রাজ্যসভার প্রার্থী হয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের শূন্য একটি আসনে আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য কোয়েল মল্লিককে প্রার্থী করার কথা জানিয়েছে বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটি।

কোয়েল মল্লিক কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা রঞ্জিৎ মল্লিকের মেয়ে। দীর্ঘদিন ধরে রঞ্জিৎ মল্লিকের পরিবার সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিল। তবে কোয়েলের রাজ্যসভার প্রার্থী হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে দলবদলের মধ্য দিয়ে পরিবারটির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আগামী ১৬ অক্টোবর রাজ্যসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ৬ অক্টোবর। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলের মনোনয়নে রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার পর বিজেপির প্রার্থী হিসেবে আবারও একই কক্ষের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন কোয়েল।
তৃণমূলের মনোনয়নে রাজ্যসভায় যাত্রা

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার চারটি শূন্য আসনের জন্য তৃণমূল কংগ্রেস চারজনকে প্রার্থী করেছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পুলিশের সাবেক আইজি রাজীব কুমার, সংগীতশিল্পী বাবুল সুপ্রিয়, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী এবং অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক।

মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চার প্রার্থীই জয়ী হন। এরপর ৬ এপ্রিল রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন কোয়েল মল্লিক।

তবে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি কোনো অধিবেশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর দলটির অভ্যন্তরে ভাঙন ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান প্রকাশ্যে আসে। একাধিক নেতা-কর্মী দল ছাড়েন এবং তৃণমূলের মধ্যে বিভিন্ন উপদল সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই তৃণমূলের রাজ্যসভার তিন সদস্য সুখেন্দু শেখর রায়, প্রকাশ চিক বরাইক ও সুস্মিতা দেব দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তাঁরা তিনজনই বিজেপির টিকিটে আবার রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
কোয়েলকে ঘিরে শুরু হয় জল্পনা

তৃণমূলের কয়েকজন রাজ্যসভা সদস্যের দলবদলের পর কোয়েল মল্লিকের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও জল্পনা শুরু হয়। তিনিও কি দল ছাড়বেন এবং বিজেপিতে যোগ দেবেন—এমন আলোচনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে জোরালো হয়ে ওঠে।

তখন কোয়েল মল্লিকের অবস্থান ছিল অনেকটাই অনিশ্চিত। তিনি সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা না দিলেও তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে।

এরই মধ্যে গত ১৬ জুলাই দিল্লিতে গিয়ে উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কোয়েল। ওই সাক্ষাতের পর তিনি রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এরপর দিল্লিতেই বিজেপির নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পরপর এসব ঘটনার পর কোয়েলের বিজেপিতে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ে। যদিও সে সময় তিনি সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেননি, রাজনৈতিক মহলে তাঁর পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল।
বিজেপির প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা

শেষ পর্যন্ত সেই জল্পনার অবসান হলো বিজেপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণায়। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের শূন্য রাজ্যসভা আসনে আসন্ন নির্বাচনে কোয়েল মল্লিককে প্রার্থী করা হয়েছে।

অর্থাৎ তৃণমূলের মনোনয়নে রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কোয়েল এবার বিজেপির প্রার্থী হিসেবে একই কক্ষের নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন।

৬ অক্টোবর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন এবং ১৬ অক্টোবর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে নামতে হবে তাঁকে।

কোয়েলের এই দলবদল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে নেতাদের যাওয়া-আসার ধারাবাহিকতার নতুন একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।
কুণাল ঘোষের ক্ষোভ

কোয়েল মল্লিকের দলবদলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, বিধায়ক ও দলের রাজ্য মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তিনি কোয়েলকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে কটাক্ষ করেছেন।

কুণাল ঘোষের বক্তব্য, তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোয়েল মল্লিককে ভালোবেসে ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, সেই সুযোগ পাওয়ার পর কোয়েলের বিজেপিতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে হতাশাজনক।

তৃণমূলের পক্ষ থেকে কোয়েলের দলবদলকে যেভাবেই দেখা হোক, বিজেপির প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিষয়টি এখন আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
অভিনেত্রী থেকে রাজনীতির ময়দানে

কোয়েল মল্লিক মূলত বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত অভিনেত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশও ছিল তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী। সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় থাকার পর নয়, বরং সরাসরি রাজ্যসভার মনোনয়ন পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় সংসদের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

তৃণমূলের মনোনয়নে রাজ্যসভায় যাওয়ার সময় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিতিই বেশি আলোচনায় ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দলবদল এবং বিজেপির প্রার্থী হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশেষ করে একই বছরে একটি দলের মনোনয়নে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরে সেই দল ছেড়ে অন্য দলের প্রার্থী হওয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত

কোয়েল মল্লিকের বিজেপির প্রার্থী হওয়া এমন সময়ে ঘটল, যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলবদল ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা চলছে। তৃণমূলের একাধিক রাজ্যসভা সদস্যের বিজেপিতে যোগদান এবং তাঁদের পুনরায় বিজেপির প্রার্থী হওয়ার পর কোয়েলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের রাজনৈতিক গতিপথ দেখা গেল।

এখন তাঁর প্রার্থিতা নির্বাচনে কী ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, সেটিই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং বিজেপিতে তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

তবে আপাতত নিশ্চিত বিষয় হলো—তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়নে রাজ্যসভার সদস্য হওয়া কোয়েল মল্লিক এখন সেই দল ছেড়ে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে আবারও রাজ্যসভার নির্বাচনে লড়ছেন। ১৬ অক্টোবরের নির্বাচনেই নির্ধারিত হবে, বিজেপির প্রার্থী হিসেবে তিনি দ্বিতীয়বার রাজ্যসভার সদস্য হতে পারেন কি না।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স