চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স)। তাঁর অভিযোগ, জনমত উপেক্ষা করে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হলে দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি প্রভাব বাড়তে পারে, যা জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠবে।
রোববার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টন মোড়ে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সিপিবির পল্টন থানা শাখা এ সমাবেশের আয়োজন করে।
চুক্তি বাতিলের দাবি
সমাবেশে রুহিন হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামোর একটি এবং এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। বন্দরে দুর্নীতি, অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা থাকলে সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা যেতে পারে এবং প্রয়োজন হলে পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের টার্মিনালের পূর্ণ পরিচালনাগত দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে হবে।
রুহিন হোসেন বলেন, দেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা উচিত নয়। তাঁর দাবি, এনসিটি পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে যে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটর
সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এবং এর ওভারফ্লো ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে অপারেটর প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরে দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আলোচনায় রয়েছে।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় এনসিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪০ শতাংশের বেশি এনসিটির মাধ্যমে হয়েছে।
এ কারণে টার্মিনালটির পরিচালনব্যবস্থায় পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে ঘিরে অর্থনৈতিক, শ্রমিকস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
‘বিদেশি আধিপত্য বাড়ার ঝুঁকি’
রুহিন হোসেন বলেন, জনমতকে উপেক্ষা করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে দেশের ওপর বিদেশি আধিপত্য আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়। এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনাও উঠে আসে। রুহিন হোসেনের অভিযোগ, দেশ উগ্র দক্ষিণপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাঁর দাবি, এসব শক্তি অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে আবারও অগণতান্ত্রিক শাসনের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে।
তবে এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ হিসেবে সমাবেশে দেওয়া হয়েছে।
‘দেশের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ প্রতিহত করতে হবে’
রুহিন হোসেন দেশের স্বার্থবিরোধী যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল, শ্রমিক-কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের অধিকার এবং দেশের কৌশলগত নিরাপত্তার বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এনসিটি নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও এর গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তে দেশের জনগণের মতামত এবং জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি
এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করে এরই মধ্যে বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি পালন করেছে। তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন দেওয়া হলে সরকারের রাজস্ব আয়, বন্দরের কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক অপারেটরের অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ফলে এনসিটি পরিচালনার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে অর্থনৈতিক দক্ষতা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় স্বার্থ—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সমাবেশে আরও যারা বক্তব্য দেন
সিপিবির পল্টন শাখার নেতা রফিজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ত্রিদীব সাহা, পল্টন থানার সভাপতি মুর্শিকুল ইসলাম শিমুল, সহসম্পাদক রবিউল ইসলাম এবং বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াত।
বক্তারা এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার আহ্বান জানান।