রহস্যময় ধাঁধা, পুরোনো সূত্র আর শহরের অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস—এই সবকিছু মিললেই যাঁদের মনে পড়ে ফেলুদার কথা, তাঁদের জন্য আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে অনীক দত্ত পরিচালিত সিনেমা ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’। নাম থেকেই বোঝা যায়, এই গল্পের প্রাণকেন্দ্র কলকাতা—এক শহর, এক স্মৃতি আর এক রহস্যের আবর্তন।
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র সাবা, ঢাকার এক তরুণী। নিজের পারিবারিক শিকড়ের সন্ধানে সে আসে কলকাতায়। এখানে এসে তার হাতে আসে বহু পুরোনো একটি খাম, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে দুর্বোধ্য এক ধাঁধা। এই রহস্যের সূত্র ধরেই তার পরিচয় হয় তোপসের সঙ্গে। ধীরে ধীরে অনুসন্ধান ছড়িয়ে পড়ে কলকাতার পরিচিত গলি থেকে পাহাড়ঘেরা দার্জিলিং পর্যন্ত। গল্প এগোয় স্মৃতি, ইতিহাস আর বর্তমান সময়ের টানাপোড়েন মিলিয়ে।
এই সিনেমা কেবল একটি গোয়েন্দা কাহিনি নয়। বরং এটি শহর কলকাতার প্রতি এক ধরনের ভালোবাসার প্রকাশ। পরিচালক অনীক দত্তের ছবিতে কলকাতা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ—এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। বলা যায়, ডিটেকটিভ গল্পের ছদ্মবেশে এখানে কলকাতাই হয়ে উঠেছে মূল চরিত্র। পুরো ছবিজুড়ে ঘুরে বেড়ায় সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার ছায়া—কখনো ধাঁধার কাঠামোয়, কখনো সংলাপের রসিকতায়, আবার কখনো অনুসন্ধানের যুক্তিবোধে।
গল্পের শুরুতে সাবাই মূল চালিকাশক্তি। পরে তোপসে যুক্ত হলে দুই প্রজন্মে বিস্তৃত এক রহস্যের অনুসন্ধান আরও গতি পায়। পুরোনো কবরস্থান, ঝাপসা ছবি, চার্চ, ফেসবুক পোস্ট, অনলাইন সূত্র—সব মিলিয়ে ক্লাসিক গোয়েন্দা গল্পের সঙ্গে আধুনিক সময়ের উপাদান জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে চিঠির জায়গা নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া, আর পুরোনো নোটবইয়ের বদলে গুগল সার্চ।
প্রথম ভাগে গল্পের টান ভালো থাকলেও পরের অংশে কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে গতি। ছবির দৈর্ঘ্য কম হলে হয়তো প্রভাব আরও জোরালো হতো। কিছু ধাঁধা আগেভাগেই আন্দাজ করা যায়, আবার কিছু দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্যতার সীমা ছুঁয়ে ফেলে। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে থাকা চিত্রকর্ম ঘিরে রহস্যের ভাবনা আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নে পুরোপুরি জমে ওঠে না।
তবে গল্পের এই দুর্বলতাগুলো অনেকটাই ঢেকে দেয় নির্মাণশৈলী। ক্যামেরায় কলকাতা ধরা পড়েছে গভীর মমতায়—কখনো নস্টালজিক, কখনো আধুনিক ব্যস্ততায় ভরা। গির্জা, কবরস্থান, পার্ক স্ট্রিট, পুরোনো বাড়ি কিংবা আঁকাবাঁকা রাস্তা—সব মিলিয়ে শহরটাকেই যেন এক বিশাল ধাঁধা বানিয়ে তোলা হয়েছে। দার্জিলিং ও কার্সিয়ংয়ের দৃশ্যপট গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করলেও মূল সুর থেকে বিচ্যুত হয় না।
অভিনয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল কাজী নওশাবা আহমেদ। পুরো সিনেমা মূলত তাঁর চরিত্রকে ঘিরেই আবর্তিত, আর তিনি সেটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামলেছেন। বাংলাদেশি অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর এই উপস্থিতি প্রশংসার দাবি রাখে। আবীর চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় সংযত ও পরিণত—মনে হয়, তিনি ফেলুদার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজস্ব এক গোয়েন্দা সত্তা গড়ে তুলেছেন। পার্শ্ব চরিত্রে অন্য শিল্পীরাও নিজেদের জায়গা ঠিকঠাক ধরে রেখেছেন।
ফেলুদার প্রতি পরিচালকের ভালোবাসা ছবির প্রায় প্রতিটি স্তরেই চোখে পড়ে। গল্পের কাঠামো, যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান, সংলাপ এমনকি সম্পাদনাতেও সত্যজিৎ রায়ের জগতের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। যাঁরা ফেলুদা পড়ে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে এসব মুহূর্ত নিঃসন্দেহে বাড়তি আনন্দ। নতুন দর্শকের কাছেও সিনেমাটি কাজ করে—একটি শহরকেন্দ্রিক ভাবনার চলচ্চিত্র হিসেবে।
আবহসংগীতের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। দেবজ্যোতি মিশ্রর সুর ছবির আবেগ, উত্তেজনা ও নস্টালজিয়ার ভিত গড়ে দেয়। রেট্রো জ্যাজ, লোকধারা আর আধুনিক সংগীতের মেলবন্ধনে তৈরি সাউন্ডস্কেপ গল্পের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে গেছে। কিছু গান আলাদাভাবে নজর কাড়ে এবং ছবির মেজাজ আরও গভীর করে।
সব মিলিয়ে ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ রহস্যধর্মী সিনেমা হিসেবে নতুন কিছু আবিষ্কার না করলেও ফেলুদার স্মৃতি, কলকাতার আবহ, অভিনয় আর সংগীতের মেলবন্ধনে একবার দেখার মতো অভিজ্ঞতা দেয়। বিশেষ করে ফেলুদাপ্রেমীদের জন্য এটি হতে পারে নস্টালজিয়ায় ভেজা একটি সফর।