দীর্ঘ টানাপোড়েন, দেনদরবার এবং শেষ মুহূর্তের টানা বৈঠকের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১০টি দল জাতীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’। তবে শুরু থেকেই এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ শরিক থাকা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি। দলটির জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রেখে বাকি ২৫৩টি আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতেই রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই নির্বাচনী মোর্চার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য তাঁরা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। দলটি নির্বাচনী ঐক্যে যুক্ত হলে ফাঁকা রাখা আসনগুলো পরে ঘোষণা করা হবে।
দলভিত্তিক আসন বণ্টন
ঘোষিত সমঝোতা অনুযায়ী,
-
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ১৭৯টি আসনে প্রার্থী দেবে।
-
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ৩০টি আসন,
-
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি আসন,
-
খেলাফত মজলিস ১০টি আসন,
-
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি আসন,
-
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ৩টি আসন,
-
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ও নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি করে আসনে প্রার্থী দেবে।
এ ছাড়া কয়েকটি আসন উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
এই নির্বাচনী ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) কোনো আসনে প্রার্থী দেবে না। তবে দল দুটি নির্বাচনী ঐক্যে শরিক হিসেবে থাকছে।
‘এবার অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন’
সংবাদ সম্মেলনে দলভিত্তিক আসনসংখ্যা ঘোষণা করেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন,
“এবারের নির্বাচন অতীতের মতো ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন নয়। এটি অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন।”
তিনি আরও বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে কিছু কিছু জায়গায় টুকটাক সমস্যা রয়েছে, তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগেই সেগুলো সমাধান হয়ে যাবে বলে তারা আশাবাদী।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এখানে যে আসনসংখ্যা ঘোষণা করা হয়েছে, তা বৈঠকে উপস্থিত দলগুলোর জন্য। উপস্থিত দুটি দল—বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাগপার ক্ষেত্রে আসনসংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি।
ইসলামী আন্দোলনের চেয়ার ফাঁকা
সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের জন্য একটি চেয়ার রাখা হলেও তিনি বা তাঁর দলের কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে বাকি ১০টি দলের শীর্ষ নেতারা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। এরপর বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের। সবার শেষে নির্বাচনী ঐক্যের মূল বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন ১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।
‘জোট ভাঙেনি, এটি নির্বাচনী ঐক্য’
সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন,
“জোট ভাঙেনি, জোট আছে। কোনো একটা দল যে কারণেই হোক একমত হলো না—এতে জোট ভাঙে না। এটি আসলে জোটও নয়, এটি একটি নির্বাচনী ঐক্য।”
ইসলামী আন্দোলনের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন,
“একটি দল সূচনায় আমাদের সঙ্গে ছিল, কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে না। এটা ভাঙনের কোনো ব্যাপার নয়। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আরও বোঝাপড়া করছেন। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। আমরা আশা করছি, তাঁরা আমাদের সঙ্গে থাকবেন।”
আজ অবস্থান জানাবে ইসলামী আন্দোলন
এরই মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জানিয়েছে, তারা আজ শুক্রবার বিকেল তিনটায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্বাচনী সমঝোতা বিষয়ে সংবাদ ব্রিফিং করবে। এতে দলের আমির সৈয়দ রেজাউল করীমসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলনের একজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন,
“জামায়াতের সঙ্গে আমাদের নির্বাচনী ঐক্যের সম্ভাবনা এখন খুবই কম।”
টানাপোড়েনের নেপথ্য কাহিনি
ইসলামপন্থীদের ভোট ‘এক বাক্সে’ নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রথমে ৮টি, পরে ১১টি দল এই ঐক্যে যুক্ত হয়। তবে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর থেকেই আসন বণ্টন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। বিশেষ করে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে সমঝোতা না হওয়াই এই টানাপোড়েনের মূল কারণ।
সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলন শুরুতে ৮০টি আসন, পরে কমিয়ে ৭০টি আসনে সমঝোতার দাবি জানায়। বিপরীতে জামায়াত শুরুতে ৪০টি, পরে ৪৫টি আসনে প্রস্তাব দেয়। এই ব্যবধানের কারণেই সমঝোতা ভেঙে পড়ার মুখে পড়ে।
গত বুধবার রাতে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে শেষ চেষ্টা হিসেবে মধ্যস্থতার দায়িত্ব দেওয়া হয় মাওলানা মামুনুল হককে। তিনি ঢাকায় ও বরিশালে দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাধান হয়নি।
এ অবস্থায় জামায়াত বিকল্প পরিকল্পনায় এগিয়ে গিয়ে ১০ দলের সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত করে। একই সঙ্গে সম্মানজনকভাবে ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভোটের মাঠে প্রভাব নিয়ে আলোচনা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ৩০০ আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়।
সব মিলিয়ে ইসলামপন্থীদের ঐক্য গড়ার যে উদ্যোগ ইসলামী আন্দোলনের হাত ধরে শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগই তাদের বাইরে রেখেই বাস্তব রূপ পেল। ইসলামী আন্দোলন শেষ মুহূর্তে যোগ দেয় কি না এবং এই ভাঙন ভোটের মাঠে কী প্রভাব ফেলবে—তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।