ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে রোববার মুম্বাইয়ে বড় ধরনের মিছিল করেছেন শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা উদ্ধব ঠাকরে ও মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার (এমএনএস) প্রধান রাজ ঠাকরে।
একই সময়ে কেরলে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের একটি পুরোনো অভিযোগের তদন্ত নতুন করে শুরুর নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। ওই মামলাটি একটি সড়ক প্রকল্প, দুর্নীতির অভিযোগ এবং মালয়েশিয়ার এক প্রকৌশলীর আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে রাজনৈতিক বিক্ষোভের পাশাপাশি দুই দশক আগের একটি তদন্তও নতুন করে সামনে এসেছে।
মুম্বাইয়ে ‘বিরাট গর্জনা মোর্চা’
রোববার মুম্বাইয়ে ‘বিরাট গর্জনা মোর্চা’ নামে এই বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। দক্ষিণ মুম্বাইয়ের মেট্রো সিনেমা এলাকা থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি বৃহন্মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (বিএমসি) সদর দপ্তরের কাছে গিয়ে শেষ হয়।
মিছিলে উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরে ছাড়াও কংগ্রেস এবং শরদ পাওয়ার নেতৃত্বাধীন এনসিপির (এসপি) নেতারা অংশ নেন। কংগ্রেস নেতা বালাসাহেব থোরাট ও বিজয় ওয়াডেত্তিওয়ার এবং এনসিপি (এসপি) নেতা জয়ন্ত পাটিল ও শশীকান্ত শিন্ডেসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এতে উপস্থিত ছিলেন।
মিছিলের আয়োজকেরা দলীয় পতাকা ব্যবহার না করে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের ওপর জোর দেন। এর মাধ্যমে কর্মসূচিটিকে কোনো একটি দলের কর্মসূচির পরিবর্তে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
মুম্বাইয়ে এই কর্মসূচির কারণে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যান চলাচলে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এর দুই দিন আগেই শিবাজি পার্কে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘জেল ভরো’ কর্মসূচি পালন করেছিল।
এসআইআর বাতিলের দাবি
মিছিল থেকে রাজ ঠাকরে এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) পরিবর্তে ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণের দাবি জানান।
তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। রাজ ঠাকরে দাবি করেন, মহারাষ্ট্রে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যাঁদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা কারা এবং কী প্রক্রিয়ায় তাঁদের ভোটার তালিকা থেকে সরানো হচ্ছে।
তবে ভোটার তালিকায় অনিয়ম বা রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এসআইআর প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ভোটার তালিকায় থাকা অযোগ্য, মৃত, স্থানান্তরিত বা একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত নাম শনাক্ত করে তালিকা পরিশুদ্ধ করা।
রাজ ঠাকরে অবশ্য কমিশনের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশনের বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
‘জ্ঞানেশকে সরাতে হবে’
মিছিলে উদ্ধব ও রাজ—দুই ঠাকরেই সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁদের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া।
উদ্ধব ঠাকরে অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তোলেন।
রাজ ঠাকরে বলেন, তাঁদের মূল দাবি হলো এসআইআর বাতিল করা এবং ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়ার দাবি জানান।
তাঁদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। তবে এটি বিরোধী নেতাদের রাজনৈতিক অভিযোগ; নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
দুই ঠাকরের এক মঞ্চ
মুম্বাইয়ের এই কর্মসূচির আরেকটি তাৎপর্য হলো, দীর্ঘ রাজনৈতিক দূরত্বের পর উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরেকে আবারও একই আন্দোলনের মঞ্চে দেখা গেল।
উদ্ধবের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি) এবং রাজের নেতৃত্বাধীন এমএনএস আলাদা রাজনৈতিক অবস্থানে থাকলেও এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এই কর্মসূচিতে তাঁরা একই দাবিতে একত্র হয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কংগ্রেস ও শরদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি (এসপি) নেতাদের অংশগ্রহণও কর্মসূচিটিকে আরও বিস্তৃত বিরোধী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে।
তবে এই রাজনৈতিক ঐক্য ভবিষ্যৎ নির্বাচনে কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। আপাতত নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনই বিভিন্ন বিরোধী দলের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
কেরলে দুই দশক আগের ফাইল খুলল
মুম্বাইয়ে রাজনৈতিক বিক্ষোভের মধ্যেই কেরলে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রায় দুই দশক আগের একটি মামলার তদন্ত নতুন করে শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০০৬ সালে জ্ঞানেশ কুমার কেরলের জনপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই সময় রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ করছিল ভারত-মালয়েশিয়ার যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান PATI-BEL। প্রকল্পটি কেরল স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতাভুক্ত ছিল এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল।
ওই প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী ও প্রজেক্ট ম্যানেজার ছিলেন মালয়েশিয়ার নাগরিক লি সি বিন। প্রকল্পের অর্থ পরিশোধ ও কাজসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর তিনি আত্মহত্যা করেন।
তৎকালীন তদন্তে তাঁর একটি কথিত আত্মহত্যার নোটে জ্ঞানেশ কুমারের নাম থাকার বিষয়টি সামনে আসে। সেখানে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগের কথা উল্লেখ ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের বিষয়।
আগের তদন্ত কেন বন্ধ হয়েছিল?
লি সি বিনের মৃত্যুর পর কেরল সরকার ঘটনাটি নিয়ে ভিজিল্যান্স তদন্ত শুরু করেছিল। কিন্তু সেই তদন্ত পরবর্তীতে আর এগোয়নি।
বর্তমান কেরল সরকারের কাছে কংগ্রেস নেতা মালয়িনকীঝু ভেনুগোপাল অভিযোগ করেন, আগের তদন্ত যথাযথভাবে পরিচালিত হয়নি এবং প্রভাব খাটিয়ে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই পুরোনো তদন্ত নতুন করে খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেরলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তের আওতায় পুরোনো ভিজিল্যান্স অনুসন্ধানের নথি এবং পিডব্লিউডির সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেরল ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরোর নেতৃত্বে এই অনুসন্ধান এগোবে।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমার পিডব্লিউডি সচিব থাকাকালে ঠিকাদারি কাজ ও অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। তবে এগুলো অভিযোগমাত্র এবং পুনঃতদন্তের উদ্দেশ্যই হলো পুরোনো অভিযোগগুলোর ভিত্তি ও আগের তদন্তের গতিপথ যাচাই করা।
জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা কতটা প্রযোজ্য?
জ্ঞানেশ কুমার বর্তমানে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার প্রণীত আইনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
তবে কেরল সরকারের বক্তব্য, ২০০৬ সালের ঘটনা তাঁর বর্তমান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ফলে ওই পুরোনো ঘটনার তদন্তে বর্তমান আইনি সুরক্ষা প্রযোজ্য হবে কি না, সেটি নিয়ে রাজ্য সরকার বাধা দেখছে না। এ বিষয়ে অবশ্য তদন্তের পরবর্তী ধাপে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে।
এখন পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমার বা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কেরল সরকারের এই পুনঃতদন্তের নির্দেশ নিয়ে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন তদন্ত
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একই সময়ে দুই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে—একদিকে নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক আন্দোলন, অন্যদিকে তাঁর অতীত দায়িত্ব পালনের সময়কার একটি পুরোনো অভিযোগের পুনঃতদন্ত।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগের মূল বিষয় এসআইআর ও ভোটার তালিকা। তাঁদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়লে প্রকৃত ভোটাররা ভোটাধিকার হারাতে পারেন। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বলছে, তালিকা পরিশুদ্ধ করার প্রয়োজনেই এসআইআর পরিচালিত হচ্ছে এবং ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যদিকে কেরলের তদন্তের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা এবং প্রায় দুই দশক আগের একটি প্রশাসনিক ও দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ফলে রাজনৈতিক বিক্ষোভ এবং পুরোনো তদন্ত—দুই ঘটনাকে একই ধরনের অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে দুটো ঘটনাই একই সময়ে সামনে আসায় জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
মুম্বাইয়ের মিছিল থেকে বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন। কেরলে শুরু হয়েছে পুরোনো অভিযোগের পুনঃতদন্ত। এর সঙ্গে দেশজুড়ে এসআইআর নিয়ে চলমান বিতর্কও যুক্ত হয়েছে। ফলে ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি এবং নির্বাচন পরিচালনার ওপর আস্থা—এই তিনটি প্রশ্ন এখন দেশটির রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।