ঢাকা

সংসদে হট্টগোল, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান–সংক্রান্ত বিষয়ে জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাব ঘিরে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক, হইচই ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। রোববার অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এ প্রস্তাব উত্থাপন করলে কয়েক দফা বাকবিতণ্ডা হয় এবং কিছু সময়ের জন্য সংসদকক্ষে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত অধিবেশনের সভাপতি ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ঘোষণা দেন, বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবটি আগামী মঙ্গলবার দুই ঘণ্টা আলোচনার জন্য নির্ধারিত থাকবে।

মুলতবি প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, জনগুরুত্বপূর্ণ নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে দিনের কার্যসূচি স্থগিত রেখে আলোচনার জন্য সংসদ সদস্যরা মুলতবি প্রস্তাব আনতে পারেন। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে নির্ধারিত অন্যান্য কার্যক্রম স্থগিত রেখে ওই বিষয়েই আলোচনা হয়।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান তাঁর প্রস্তাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’–সংক্রান্ত ৪৮টি সংবিধান–প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়টি উত্থাপন করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বাস্তবায়ন আদেশ ও পরবর্তী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় বর্তমান সংসদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করার কথা ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে বিএনপি ও তার জোট থেকে নির্বাচিত সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি—এ বিষয়টিকেই তিনি ‘অচলাবস্থা’ হিসেবে আখ্যা দেন। তাঁর ভাষায়, “জাতির প্রত্যাশা উপেক্ষা করে এ ধরনের স্থবিরতা কাম্য নয়।”

প্রশ্নোত্তর শেষে শুরু বিতর্ক

ঈদের ছুটির পর এদিন সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে শফিকুর রহমান তাঁর নোটিশ উত্থাপন করেন এবং তাৎক্ষণিক আলোচনার দাবি জানান।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত কার্যসূচি—প্রশ্নোত্তর ও বিধি-৭১–এর নোটিশের আলোচনা—শেষ হওয়ার পর অন্য বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দিতে চাইলে বিরোধী সদস্যরা আপত্তি জানান। তবে ডেপুটি স্পিকার তাঁকে কথা বলার সুযোগ দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার আলোচনার বিরোধিতা করছে না, তবে কার্যপ্রণালি বিধি মেনেই এগোতে হবে।

এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—দুই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে। কিন্তু কার্যক্রমে গণভোটের বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য: সময় নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব

বিধি-৭১–এর আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় মুলতবি প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা হয়। এ সময় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবটি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী; তবে আলোচনার আগে প্রস্তুতির জন্য সময় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিতে হলে সংসদ সদস্যদের সামনে সংবিধান, জুলাই জাতীয় সনদ, বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশসহ প্রাসঙ্গিক নথিপত্র থাকা প্রয়োজন। এমনকি ঐতিহাসিক দলিল ও রাজনৈতিক দর্শনের বই—হবস, লক ও রুশোর ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ তত্ত্ব—উপস্থাপনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ বিষয়ে সময় নির্ধারণ করে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা চায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আপত্তি ও হট্টগোল

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার নোটিশ কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ অনুযায়ী হয়নি; এটি ৬৮ ধারায় সংশোধন সাপেক্ষে আনা উচিত ছিল। তিনি বলেন, “আমি প্রস্তাবের বিরোধিতা করছি না, তবে নোটিশটি বৈধভাবে দেওয়া হয়নি।”

এ বক্তব্যে বিরোধী সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। সংসদকক্ষে তীব্র হট্টগোল শুরু হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের কাছে ‘প্রটেকশন’ চেয়ে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ চান।

তিনি আরও বলেন, বিধি ৬৩ অনুযায়ী এমন কোনো প্রস্তাব আনা যায় না, যার প্রতিকার কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সম্ভব। এখানে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, তাই তা আইন প্রণয়নের আওতায় পড়ে।

কমিটি গঠনের প্রস্তাব

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, কমিটি চাইলে সংসদের বাইরে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিশিষ্টজন, সম্পাদক ও অংশীজনদের মতামত নিতে পারে। সরকার সমঝোতার ভিত্তিতে সংশোধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায়।

তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ সরাসরি সংবিধান পরিবর্তন করেনি; বরং সংশোধনের পথ দেখিয়েছে।

স্পিকারের রুলিং

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান পুনরায় বক্তব্য দিয়ে আগে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরুর আহ্বান জানান।

পরিস্থিতি বিবেচনায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ঘোষণা দেন, কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী তিন দিনের মধ্যে প্রস্তাব নিষ্পত্তি করতে হবে। সে অনুযায়ী ৩১ মার্চ দিনের সর্বশেষ কার্যসূচি হিসেবে দুই ঘণ্টা আলোচনা নির্ধারণ করা হলো।

তাঁর এ সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরও কিছু সময় হট্টগোল চলতে থাকে। অবশেষে স্পিকার পরবর্তী কার্যসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দেন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা শুরু হয়।

সংসদে অচলাবস্থার ইঙ্গিত?

দিনের আলোচনায় বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, গণভোটের ফল উপেক্ষা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন বিলম্বিত করা হচ্ছে। অপরদিকে সরকার বলছে, কার্যপ্রণালি বিধি মেনেই যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সমঝোতার ভিত্তিতে সংশোধন প্রক্রিয়া এগোবে।

মঙ্গলবার নির্ধারিত আলোচনায় এই বিতর্কের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দিকগুলো আরও স্পষ্ট হবে বলে সংসদ–সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স