যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার কোনো বিষয়ই এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব ‘চূড়ান্ত অনুমোদনের’ কথা বলেছেন, বাস্তবে তার সঙ্গে মেলে এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে সরাসরি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ইরান এখনো কোনো চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।”
‘খসড়া আছে, কিন্তু চূড়ান্ত নয়’
বাঘাই জানান, আলোচনার খসড়ার বেশ কিছু অংশ এগোলেও এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন নতুন দাবি ও শর্ত যুক্ত হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “খসড়ার অনেক অংশ এগিয়েছে, তবে এখনো তা চূড়ান্ত চুক্তির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি যোগ করছে।”
মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও কাতার
ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনায় পাকিস্তান এবং কাতার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। এই দুই দেশ কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আলোচনা এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা
বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন ইসমাইল বাঘাই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে বলেন, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কারণে প্রণালিটি তুলনামূলকভাবে কম নিরাপদ হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে বিবেচিত, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ট্রাম্পের ‘চুক্তি অনুমোদন’ দাবি
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ মূল বিষয়গুলো অনুমোদন করেছে।
তিনি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে বলেন, চুক্তির বিস্তারিত ও শর্তাবলি অনুমোদিত হয়েছে এবং খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হতে পারে।
পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইউরোপের কোনো স্থানে সপ্তাহান্তে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। তবে তিনি নিজে উপস্থিত থাকতে পারবেন না, বরং অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অংশ নেবেন।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, চুক্তি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস পাবে।
যুদ্ধবিরতি ও চলমান উত্তেজনা
চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়, যার জবাবে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা আঘাত করে।
পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সীমিত আকারে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
মধ্যস্থতামূলক আলোচনা ও অনিশ্চয়তা
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ আলোচনার টেবিলে বসলেও তখনো চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এরপর সাময়িক যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও প্রকৃত সমঝোতা এখনও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
ইরানের সর্বশেষ অবস্থান অনুযায়ী, আলোচনার অগ্রগতি থাকলেও চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য হয়নি—যা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি ভিন্ন অবস্থান তৈরি করেছে।