ঢাকা

‘লুটেরাদের হাতেই আবার ব্যাংক’: সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন ও অধ্যাদেশ সংশোধন নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও আইনজীবী শিশির মনির অভিযোগ করেছেন, নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ‘ব্যাংক ডাকাতদের কাছেই আবার ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে’, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য বিপজ্জনক ইঙ্গিত বহন করে।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশে পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন

শিশির মনির বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশে সংশোধন এনে এমন বিধান যুক্ত করেছে, যার ফলে আগের মালিকানা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফেরত দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তাঁর অভিযোগ, এই পরিবর্তনের ফলে অতীতে যাঁরা ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িত ছিলেন, তাঁদেরই পুনরায় নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ সরানোর অভিযোগ

জামায়াতের এই নেতা দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২৪টি ‘কাগুজে’ কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ নেওয়া হয়, যেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব নেই।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন উৎস থেকে ২ শতাংশের বেশি শেয়ার সংগ্রহ করে বোর্ডে প্রভাব বিস্তার করে একটি গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এখন সেই শেয়ার আবার পূর্বের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

‘আর্থিক লেনদেনের প্রভাব’ অভিযোগ

ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধনের পেছনে শুধু সরকারের সিদ্ধান্ত নয়, বরং বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন জড়িত থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন শিশির মনির। তাঁর দাবি, এভাবে দেশের মানি মার্কেটকে পুনরায় নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে তাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

গুম অধ্যাদেশ ও গণভোট প্রসঙ্গে সমালোচনা

সংবাদ সম্মেলনে গুম–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ নিয়ে সরকারের অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ করেন শিশির মনির। তিনি বলেন, গুমের সংজ্ঞা নিয়ে সরকারের দেওয়া ব্যাখ্যা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

গণভোট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ-এর ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালেট’ মন্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যদি গণভোট বৈধ হয়, তাহলে সেটির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

বিচারকদের শোকজ নিয়ে প্রশ্ন

সম্প্রতি ২৮ জন বিচারককে শোকজ করার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যে আইনের ভিত্তিতে এই শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটি বর্তমানে কার্যকর নেই এবং সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যে তা বাতিল করেছে। ফলে এ ধরনের পদক্ষেপ আইনগত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

‘প্রতিকারের পথ নেই’—গুম ইস্যুতে উদ্বেগ

বর্তমান পরিস্থিতিতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর কোনো প্রতিকার ব্যবস্থা নেই বলেও দাবি করেন শিশির মনির। তিনি বলেন, পুলিশ, মানবাধিকার কমিশন বা ট্রাইব্যুনাল—কোনো জায়গাতেই ভুক্তভোগীরা সঠিক প্রতিকার পাচ্ছেন না।

‘সরকারি দল অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান (মোমেন) অভিযোগ করেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটির আলোচনার ভিত্তিতে বিল উত্থাপনের বিষয়ে যে ঐকমত্য ছিল, তা সরকার রক্ষা করেনি।

তিনি বলেন, বিশেষ কমিটির রিপোর্টে বিরোধী দল এমনকি সরকারি দলের কিছু সদস্যের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উপেক্ষা করা হয়েছে, যা সংসদীয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, মানবাধিকার ইস্যু এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতবিরোধ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।

ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শক্তিশালী আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স