জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বেরিয়ে যেতে পারে—এমন আলোচনা নিয়ে দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, বিষয়টি এনসিপি কিংবা জামায়াত—কোনো পক্ষেরই এজেন্ডা নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি রসিকতা করে বলেছেন, ‘যার বাড়িতে বিয়ে তার কোনো ঠেকা নাই, আর পাড়া–পড়শির ঘুম নাই।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমানসহ এনসিপি, ছাত্রশক্তি, যুবশক্তি ও নারীশক্তির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা–কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এনসিপির ১১–দলীয় ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চললেও শফিকুর রহমানের বক্তব্যে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়ার অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। তিনি জানান, এই ঐক্য কোনো আনুষ্ঠানিক বা স্থায়ী জোটের কাঠামোয় গঠিত হয়নি; বরং নির্বাচনী ঐক্য হিসেবে এটি গড়ে উঠেছে এবং বর্তমানে জনগণের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট দলগুলো একসঙ্গে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
‘আমরা তো কোনো ফরমাল জোট না’
১১–দলীয় ঐক্যের ধরন ব্যাখ্যা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা তো সেই অর্থে কোনো ফরমাল জোট না। আমরা একটা নির্বাচনী ঐক্য করেছি। আর এখন জনগণের স্বার্থে আমরা একসঙ্গে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি।’
জোটের ভেতরে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কোনো দলকে জোর করে ঐক্যে রাখা সম্ভব নয় উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা তো কাউকে আসলে জোর খাটাতে পারি না। এ অধিকার আমাদের নাই। গণতন্ত্রে তার প্ল্যাটফর্ম চয়েস করার অধিকার প্রত্যেকেরই থাকবে। তবে আমরা চেষ্টা করব দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করার।’
জোট রাজনীতির পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরলেন
১১–দলীয় ঐক্য থেকে দুটি দল বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। তিনি জানান, রাজনৈতিক জোটের পরিসর ও শরিক দলের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়।
তিনি বলেন, শুরুতে চারটি দল নিয়ে ঐক্য ছিল। পরে এরশাদ বেরিয়ে গেলে তাঁর একটি অংশ নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে থেকে নতুন জাতীয় পার্টি গঠন করে। এরপর চারদলীয় ঐক্য থেকে ১৮ দল, পরে ২০ দল এবং একপর্যায়ে ২৭টি দল নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমন্বয় তৈরি হয়েছিল। তবে রাজনৈতিকভাবে সেটি ২০–দলীয় ঐক্যজোট নামেই পরিচিতি পেয়েছিল।
শফিকুর রহমানের ভাষ্য, জোটের কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও রাজনৈতিক ঐক্যের একটি নিজস্ব ব্র্যান্ড বা পরিচিতি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই বর্তমান ১১–দলীয় ঐক্যের ক্ষেত্রেও কোনো দল তার অবস্থান পরিবর্তন করলে সেটিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই দেখছেন তিনি।
ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়ে ‘হোমওয়ার্ক’ শুরু
এদিকে সম্ভাব্য ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের আমির জানান, এ নিয়ে তাঁদের ‘হোমওয়ার্ক’ শুরু হয়েছে। শুধু শরিক দলগুলোর সম্ভাবনাময় নেতাদের নয়, দেশ ও বিদেশে থাকা যোগ্য এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, বিশ্বের যেকোনো স্থানে থাকা যোগ্য ও অভিজ্ঞ বাংলাদেশিদের দক্ষতাকে দেশের কাজে লাগানো হবে। তাঁদের ভাষায়, এসব ব্যক্তির ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ বাংলাদেশে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হবে।
এর মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন, প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
বিরোধী দল প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না: শফিকুর
আলোচনায় সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিরোধী দল প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি দাবি করেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের আসনে সেই তুলনায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। বিরোধী দলের কার্যকর সংসদীয় ভূমিকা পালনের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়েও বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলে বিএনপির একজন বিশিষ্ট দায়িত্বশীল নেতা ভোট জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়ার কথা বললেও উন্নয়ন বিএনপির কাছে চাওয়ার কথা বলেছেন। শফিকুর রহমানের মতে, উন্নয়ন কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়ার বিষয় নয়; এটি নাগরিকদের অধিকার।
সংরক্ষিত নারী আসন নিয়েও আপত্তি
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের বিরোধী দলের আসনে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন শফিকুর রহমান।
তাঁর দাবি, সংবিধানে এ ধরনের ব্যবস্থার কোনো বিধান নেই এবং অতীতের সংসদীয় গণতন্ত্রেও এমন নজির দেখা যায়নি। বিরোধী দলের আসন ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে সংবিধান ও সংসদীয় রীতিনীতি যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর জোর দেন তিনি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ
গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় সরকার বাস্তবায়ন করছে না বলেও অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। তাঁর দাবি, নির্বাচনের পর বড় ধরনের বিজয় পাওয়ার পর সরকার গণভোটের ফলকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
শফিকুর রহমান বলেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কার্যকর পরিবর্তনের প্রত্যাশায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনের পর সরকার সেই রায়ের কথা ভুলে গেছে এবং তা বাস্তবায়ন করতে চাইছে না।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১–দলীয় ঐক্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, তাঁরা সংসদের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চাইলেও সরকার তাঁদের রাজপথে আন্দোলনে যেতে বাধ্য করেছে।
‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ হয়নি’
এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তও অর্জিত হয়নি। এসব লক্ষ্য সামনে রেখে তাঁরা সংসদের ভেতরে ও বাইরে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে ১১–দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও তাঁদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারের দাম নিয়েও ক্ষোভ
দেশের চলমান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং সারের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। এসব সংকটে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এসব সমস্যার বিরুদ্ধে তাঁরা সংসদে কথা বলবেন এবং প্রয়োজন হলে রাজপথেও কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, তাঁদের আন্দোলনে যেসব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি যুক্ত হতে চায়, তাদের জন্য ঐক্যের দরজা খোলা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সরকার ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় গণতান্ত্রিক শক্তি, বাংলাদেশপন্থী এবং ইসলামের পক্ষের শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঐক্য ধরে রাখার বার্তা, তবে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাও স্বীকার
এনসিপির সম্ভাব্য জোটত্যাগ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমানের বক্তব্যে একদিকে যেমন বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত না করার বার্তা এসেছে, অন্যদিকে শরিক দলগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও স্বীকার করা হয়েছে।
জামায়াত আমিরের বক্তব্য অনুযায়ী, ১১–দলীয় ঐক্য কোনো আনুষ্ঠানিক স্থায়ী জোট নয়; এটি নির্বাচনী সমন্বয় থেকে তৈরি হওয়া একটি রাজনৈতিক ঐক্য, যা বর্তমানে জনগণের বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছে। ফলে শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করবে জামায়াত।
অন্যদিকে এনসিপির বক্তব্যেও বর্তমান ঐক্যের রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো সামনে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সংস্কার, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান—এসব ইস্যুতে সংসদ ও রাজপথে সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছে দলটি।
ফলে এনসিপির জোট ছাড়ার আলোচনা আপাতত রাজনৈতিক মহলের আগ্রহের বিষয় হলেও জামায়াতের পক্ষ থেকে এটিকে তাৎক্ষণিক কোনো সংকট হিসেবে দেখার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং পারস্পরিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে ঐক্যকে শক্তিশালী রাখার চেষ্টার কথাই জানিয়েছেন শফিকুর রহমান।