বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখকে ঘিরে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-১২ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন)। তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী পয়লা বৈশাখের সাংস্কৃতিক চর্চাকে ধারণ করে এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়—এমন সব সংস্কৃতিকে গ্রহণে দলটির কোনো আপত্তি নেই।
আজ মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) রাজধানীতে বৈশাখী শোভাযাত্রা শুরুর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
‘সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সহাবস্থান’
সাইফুল আলম খান বলেন, মানুষের মঙ্গল–অমঙ্গলের মালিক একমাত্র রাব্বুল আলামিন। তবে কোনো সম্প্রদায় যদি নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পালন করে, তাতে জামায়াতে ইসলামী বাধা সৃষ্টি করতে চায় না।
তিনি বলেন, “তৌহিদ ও রিসালাতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়—এমন সব সংস্কৃতিকে ইসলাম ধারণ করে। ইসলাম সব সময় স্থানীয় সংস্কৃতি ধারণ করে, এটি ইসলামের সৌন্দর্য।”
পয়লা বৈশাখের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলা নববর্ষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সেই ঐতিহ্য থেকেই প্রতিবছর দেশে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপিত হয়ে আসছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় বজায় রেখে সকল জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে উৎসব উদ্যাপনই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ।
‘দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি অঙ্গীকার’
জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ভবিষ্যতে দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে সব ধরনের দেশীয় সংস্কৃতি ধারণ, লালন ও পালন করা হবে। তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলনীতি—তৌহিদ ও রিসালাত—বিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে তারা অংশ নেবেন না বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ঢাকাকে এখনো “মসজিদের শহর” বলা হয়, যা দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। গ্রামীণ জীবনে কৃষকের আজান দিয়ে নামাজ আদায়ের দৃশ্য এবং দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় অনুশাসনের উপস্থিতিও তিনি দেশের ঐতিহ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
সকাল পৌনে নয়টার দিকে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে “নববর্ষের নব স্বপ্নে নব উদ্যমে জাগো” প্রতিপাদ্যে বৈশাখী শোভাযাত্রা শুরু হয়। আয়োজনটি করে দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ।
শোভাযাত্রায় অংশ নেন জামায়াত-সমর্থিত একাধিক সংসদ সদস্য ও নেতারা। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল।
শোভাযাত্রায় দেশীয় ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জীবনের প্রতীকী উপস্থাপন দেখা যায়। শিশুদের অংশগ্রহণে রঙিন পোশাক, জাতীয় পতাকা, ঘুড়ি, কুলা, চাঁই ও মাছ ধরার প্রতীকী দৃশ্য শোভাযাত্রাকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে। একাংশে অংশগ্রহণকারীরা পালকি, মসজিদ, দেশীয় ফল ও মাছের প্রতীকী প্রদর্শনী উপস্থাপন করেন।
শোভাযাত্রাটি হাইকোর্ট মোড় হয়ে রমনা পার্ক এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।
রমনা পার্কে বৈশাখী উৎসব
পরে রমনা পার্কের বকুলতলায় শুরু হয় বৈশাখী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা বেলা ৩টা পর্যন্ত চলবে। অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় চিরায়ত বাংলা গান, দেশাত্মবোধক সংগীত, জারি-সারি, গম্ভীরা, আবৃত্তি, পুঁথিপাঠ ও নাটিকা।
আয়োজকদের মতে, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে দেশীয় সংস্কৃতিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরা।
সব মিলিয়ে পয়লা বৈশাখের এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের এক ধরনের সমন্বিত প্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে, যা এবারের নববর্ষ উদ্যাপনকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।