ঢাকা

চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে সাফল্য: ময়মনসিংহ ওয়েলফেয়ার স্কুলের বিশেষ হয়ে ওঠার যাত্রা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
২০১৭ সালে ময়মনসিংহ শহরে ‘ওয়েলফেয়ার স্কুল’ নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। উন্নত বিশ্বের আদলে একটি আধুনিক, কোচিংনির্ভরতা-মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল উদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্য। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, দৈনন্দিন যত্ন, খাবার ও খেলাধুলার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ—যাতে স্কুল শেষে কোনো শিশুকে আলাদা করে প্রাইভেট পড়তে না হয়।
শুরুতে পরিকল্পনাটি সফলভাবেই এগোচ্ছিল। অভিভাবকদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক আগ্রহ। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মাথায় ঘটে এমন একটি ঘটনা, যা পুরো প্রতিষ্ঠানের পথচলাকে আমূল বদলে দেয়।
এক শিশুর আগমনে বদলে যায় দৃষ্টিভঙ্গি
স্কুলে ভর্তি হয় ‘উৎস’ নামের এক বিশেষ শিশু। তার আচরণ ছিল অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা—শিক্ষকদের নির্দেশনা না মানা, সহপাঠীদের সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ এবং পড়াশোনায় চরম অনাগ্রহ দ্রুতই স্কুলের স্বাভাবিক পরিবেশে অস্থিরতা তৈরি করে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে এক পর্যায়ে একজন অভিভাবক ক্ষোভে নিজের সন্তানের ভর্তি বাতিল করে দেন।
এই অবস্থায় স্কুল কর্তৃপক্ষ উৎসের অভিভাবকদের ডেকে পাঠায়। সেখানেই উঠে আসে এক নির্মম বাস্তবতা—উৎস বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত এবং এর আগে পাঁচটি স্কুল থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তার চিকিৎসা চলছিল ভারতে। এই তথ্য সামনে আসতেই বদলে যায় প্রতিষ্ঠাতা ড. মানস কান্তি সাহা-এর দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি উপলব্ধি করেন, সমস্যাটি শিশুটির নয়; বরং আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাই এমন শিশুদের গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়।
কঠিন সিদ্ধান্ত, নতুন পথচলা
একদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, অন্যদিকে একটি বিশেষ শিশুর ভবিষ্যৎ—এই দ্বন্দ্বের মুখে দাঁড়িয়ে সহজ পথ বেছে নেননি মানস কান্তি সাহা। বরং তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ শুরু করেন এবং জানতে পারেন দেশে অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা ও স্নায়বিক সমস্যায় ভোগা শিশুদের জন্য উপযোগী ও সাশ্রয়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তীব্র অভাব রয়েছে।
এই উপলব্ধিই হয়ে ওঠে মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত।
২০১৭ সালের শেষ দিকে তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন—সাধারণ স্কুলটি বন্ধ করে দিয়ে মাত্র ২০ জন বিশেষ শিশুকে নিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও ছিল এক গভীর মানবিক দায়বদ্ধতা এবং দৃঢ় মনোবল।
ধীরে ধীরে সাফল্যের পথে
শুরুটা ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। তবে শিশুবিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ধাপে ধাপে এগোতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হতে শুরু করে ইতিবাচক পরিবর্তন। যেসব শিশু আগে কথা বলতে পারত না, তারা ধীরে ধীরে যোগাযোগ করতে শিখছে; যারা নিজের কাজ নিজে করতে পারত না, তারা হয়ে উঠছে স্বনির্ভর।
বর্তমানে ওয়েলফেয়ার স্কুল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। এখানে শুধু অটিজম নয়, শিখন দুর্বলতা ও নানা মানসিক চ্যালেঞ্জে থাকা শিশুরাও সমন্বিত শিক্ষা ও থেরাপি সেবা পাচ্ছে।
ব্যতিক্রমী ফি কাঠামো ও মানবিক উদ্যোগ
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যতিক্রমী ফি কাঠামো। এখানে কোনো নির্দিষ্ট টিউশন ফি নেই—অভিভাবকেরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ প্রদান করেন। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে পড়াশোনা, থেরাপি এমনকি যাতায়াত খরচও বহন করে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে এখানে ২২ জন প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও ৪ জন অফিস সহকারী কাজ করছেন। এছাড়া EMK Center-এর সহায়তায় গড়ে উঠেছে একটি ভোকেশনাল ল্যাব, যেখানে বিশেষ শিশুরা কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
পরিসংখ্যানেই সাফল্যের প্রতিচ্ছবি
প্রতিষ্ঠানটি থেকে এখন পর্যন্ত ৬০০-এর বেশি শিশু সেবা নিয়েছে। এর মধ্যে ২০০-এরও বেশি শিক্ষার্থী উন্নতি করে পুনরায় সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছে—যা এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ড. মানস কান্তি সাহা ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাবে।
তিনি বলেন,
“আমাদের সমাজে বিশেষ শিশুদের পরিবারগুলো অনেক মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। আমরা চেয়েছি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে তারা অবহেলিত হবে না। আমাদের লক্ষ্য ব্যবসায়িক নয়, বরং মানবিক। যখন দেখি কোনো শিশু, যে আগে কথা বলতে পারত না, এখন হাসিমুখে স্কুলে আসছে বা নিজের কাজ নিজে করতে পারছে—এই তৃপ্তি অন্য যেকোনো সাফল্যের চেয়ে বড়।”
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং অবিচল প্রচেষ্টার সমন্বয়ে ময়মনসিংহ ওয়েলফেয়ার স্কুল আজ এক অনন্য উদাহরণ—যেখানে শিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনের নয়, বরং মানবিকতারও এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স