ঢাকা

রাইটার্সে ফিরছে সচিবালয়, পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনে শুরু নতুন অধ্যায়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনিক কেন্দ্র, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং শীর্ষ প্রশাসনিক উপদেষ্টা পর্যায়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রদবদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে বর্তমানে ব্যবহৃত নবান্ন থেকে সচিবালয়কে পুনরায় ঐতিহ্যবাহী রাইটার্স বিল্ডিং-এ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা সামনে এসেছে। পাশাপাশি শীর্ষ প্রশাসনিক স্তরে একাধিক উপদেষ্টার পদত্যাগ এবং ভিআইপি নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নির্বাচনের ফল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় অনুষ্ঠিত রাজ্যের ২৯৪টি আসনের ভোটের ফল ঘোষণা হয় ৪ মে। এতে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে জয় পায়।

একটি আসনে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ভোট কারচুপির অভিযোগে। তবে বাকি ফলাফলের ভিত্তিতেই নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

নতুন সরকার শপথ নিতে পারে ৯ মে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকীর দিন—এমন সম্ভাবনার কথাও রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

প্রশাসনের কেন্দ্র ফের রাইটার্সে ফেরানোর পরিকল্পনা

নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো প্রশাসনিক কেন্দ্র নবান্ন থেকে সরিয়ে আবার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।

বর্তমান নবান্ন ভবনটি হাওড়ার শিবপুরে অবস্থিত ১৪ তলা একটি প্রশাসনিক কমপ্লেক্স, যা ২০১৩ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে সচিবালয় হিসেবে চালু করেন।

অন্যদিকে রাইটার্স বিল্ডিং কলকাতার ডালহৌসি এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রশাসনিক ভবন, যা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মূল সচিবালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

বিজেপি নেতৃত্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় এলে দ্রুত সংস্কার শেষে রাইটার্স বিল্ডিংকে আবার প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় করা হবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন

রাজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ভিআইপি নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বাড়ি এবং রাজনৈতিক কার্যালয়ের আশপাশ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে।

কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিট এলাকায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দপ্তরের সামনে থেকেও পুলিশি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

একইভাবে মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের আশপাশে থাকা ব্যারিকেড ও কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণও শিথিল করা হয়েছে।

প্রশাসনিক পদত্যাগ ও উপদেষ্টা পরিবর্তন

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব প্রশাসনিক স্তরেও পড়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্য উপদেষ্টা পদ থেকে দুই সাবেক মুখ্যসচিব—আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী—পদত্যাগ করেছেন।

তাঁদের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সচিব পদ থেকেও আরেক শীর্ষ আমলার পদত্যাগের খবর পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া

নির্বাচনের ফল নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, ভোটে অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। তিনি পদত্যাগ না করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং রাজ্যপালের দপ্তরে না যাওয়ার অবস্থানও জানিয়েছেন।

তার এই অবস্থান ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে প্রস্তুতি

বিজেপি সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতা সফরে আসতে পারেন নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রশাসনিক প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঐতিহাসিক প্রশাসনিক কেন্দ্রের প্রত্যাবর্তন বিতর্ক

রাইটার্স বিল্ডিংকে আবার সচিবালয় হিসেবে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা ঘিরে প্রশাসনিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ একে ঐতিহাসিক প্রশাসনিক ঐতিহ্যে ফেরা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক প্রতীকী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করছেন।



নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নবান্ন থেকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা, নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন এবং শীর্ষ প্রশাসনিক পদে রদবদল—সব মিলিয়ে রাজ্যের ক্ষমতা কাঠামোতে বড় ধরনের পুনর্গঠন শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স