মিথ্যা মামলা দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে দাবি করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, যারা এ ধরনের কাজ করে, তাদের কাছে ন্যায়বিচার নেই; আছে জুলুম।
জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। রোববার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘দুর্নীতি, চুরির সঙ্গে যারা জড়িত, মিথ্যা মামলা দিয়ে দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের যারা আদালতের কাঠগড়ায় ওঠায়, এদের কাছে কোনো ইনসাফ নেই, এদের কাছে জুলুম আছে।’
আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তার নিয়ে জামায়াতের প্রশ্ন
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা ও তাঁর গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নির্দেশনা ছাড়া তাঁর ওপর এত বড় ধরনের ‘জুলুম’ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বিএনপি থেকে আখতারুজ্জামানের বেরিয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর প্রতি যে রাজনৈতিক আক্রোশ তৈরি হয়েছিল, তাঁকে লাঞ্ছিত করার সুযোগ পেয়ে সেই আক্রোশ থেকেই মামলা দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। তবে বিমানবন্দরের ঘটনার জন্য প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা আরও দাবি করেন, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক ইঙ্গিতেই আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের ঘটনার পর দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শুধু সাময়িক বরখাস্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি সম্ভব নয়।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা, কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
‘মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ’
আখতারুজ্জামানকে আদালতে নেওয়ার সময় তাঁর হাতে হ্যান্ডকাফ, মাথায় হেলমেট এবং শরীরে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, সাধারণত ‘দুর্ধর্ষ আসামি’, খুনি বা ডাকাতদের ক্ষেত্রে এ ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, আখতারুজ্জামান খুনি বা ডাকাত নন; তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতির শ্রেষ্ঠ সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আখতারুজ্জামানের হাতে হ্যান্ডকাফ, মাথায় হেলমেট ও শরীরে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা এবং ডিভিশন না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনেও ‘রাজনৈতিক অশুভ হস্তক্ষেপ’ রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ বা অন্য পক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
আদালতে ‘মব’ করার অভিযোগ
রোববার আদালতে আখতারুজ্জামানের শুনানিকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ‘মব’ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি দাবি করেন, বিএনপির আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করেছেন এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। আদালতে উপস্থিত জামায়াতের আইনজীবীদের ওপরও হামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আদালতে যে ধরনের ঘটনা ঘটানো হতো, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
তবে আদালত প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আখতারুজ্জামানকে মুক্তির দাবি
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে তাঁকে গ্রেপ্তার ও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার পেছনে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখারও দাবি জানানো হয়।
গোলাম পরওয়ার সতর্ক করে বলেন, আখতারুজ্জামানকে মুক্তি না দিলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে। এ বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, সবকিছুর মধ্যে রাজনীতি খোঁজা উচিত নয়। বিমানবন্দরের ঘটনায় কেন ট্রলি পাওয়া যায়নি, কেন জমজমের পানি খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কেন যাত্রীদের তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে—এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
গ্যাসের দাম বাড়ানোর সমালোচনা
সংবাদ সম্মেলনে দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও জনজীবনসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। বিশেষ করে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে তিনি সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, তাঁরা এ সিদ্ধান্তের নিন্দা করছেন। তবে বারবার নিন্দা জানাতে জানাতে ‘নিন্দা’ শব্দটির গুরুত্ব কমে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, একটি সরকার যদি অল্প সময়ের মধ্যে একাধিকবার তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় এবং এরপর গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়, তাহলে এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে।
গোলাম পরওয়ার অবিলম্বে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই সঙ্গে সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা।
‘সিন্ডিকেট ব্যবসার’ অভিযোগ
পণ্যের দাম ও সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, দেশে ‘সিন্ডিকেট ব্যবসা’র মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন পর্যায়ে দাম বাড়ানো, বড় প্রকল্প গ্রহণ এবং নানা ধরনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁদের স্বজনদের সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোথায় দাম বাড়ানো হবে, কোথায় বড় প্রকল্প দেওয়া হবে—এসবের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটা আয়-উপার্জনের একটা হাট বানানো হয়েছে, পলিটিক্যাল হাট। সেই হাটের ভাগ-বাঁটোয়ারা হইতেছে।’
এ বক্তব্যের মাধ্যমে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনা তুলে ধরেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আবদুল হালিম ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনসহ অন্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার ও তাঁর মুক্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের ঘটনাসহ সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজনৈতিক পরিচয় বা মতপার্থক্যের কারণে কোনো নাগরিকের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রেপ্তার, আদালতে উপস্থাপন এবং তাঁর সঙ্গে নেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসা প্রয়োজন।
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলার আইনগত ভিত্তি, বিমানবন্দরের ঘটনার তদন্ত এবং আদালত প্রাঙ্গণে রোববারের পরিস্থিতি—এসব বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপরই এখন বিষয়টির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে।