ঢাকা

স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন: সইয়ের শর্ত বাদ, জামানত বাড়ানোর পরিকল্পনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ভোটারদের সমর্থনসূচক সই জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়ার পাশাপাশি জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা করছে কমিশন।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব নির্বাচন হবে দলীয় প্রতীক ছাড়া। ফলে নির্বাচন পরিচালনা ও আচরণ বিধিমালায় ব্যাপক সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দলীয় প্রতীক ছাড়াই নির্বাচন

সম্প্রতি আইন সংশোধনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন নির্বাচনে মেয়র, চেয়ারম্যান ও অন্যান্য পদে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিধান বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো হবে নির্দলীয় প্রতীকে।

এই পরিবর্তনের পর নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালায় নতুন করে সংস্কার আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে।

প্রার্থী নিয়ন্ত্রণে ‘জামানত বাড়ানোর’ ভাবনা

ইসি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হলে প্রার্থীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে “ডামি” বা অপ্রাসঙ্গিক প্রার্থীর উপস্থিতি বেড়ে গেলে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা করছে কমিশন।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামানতের হার—

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান: ৫ হাজার টাকা
সদস্য: ১ হাজার টাকা
পৌরসভা মেয়র: ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা (জনসংখ্যাভেদে)
কাউন্সিলর: ৫ হাজার টাকা
সিটি করপোরেশন মেয়র: ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা
কাউন্সিলর: ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা

নতুন সংস্কারে এই পরিমাণ আরও বাড়ানো হতে পারে।

ভোটারদের সই জমার বিধান বাদ দেওয়ার উদ্যোগ

বর্তমান নিয়মে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের সমর্থনসূচক সই জমা দিতে হয়। তবে কমিশন এই শর্ত বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

ইসির একাধিক সূত্র জানায়, এই বিধান বাতিল করা হলে নতুন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রার্থী হওয়া সহজ হবে। তবে একই সঙ্গে প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

আগের কমিশনের উদ্যোগ ও বর্তমান ভাবনা

এর আগে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামানত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে জামানত ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা এবং ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছিল।

একই সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভোটার সমর্থনসূচক সই জমার বিধানও তখন বাতিল করা হয়।

বর্তমান কমিশন সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে আরও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

‘ডামি প্রার্থী’ ঠেকাতে ভারসাম্যের চেষ্টা

ইসি সূত্র বলছে, কমিশনের ভেতরে মত রয়েছে যে শুধু জামানত বাড়ালেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। আবার অতিরিক্ত জামানত নির্ধারণ করলে যোগ্য ও সাধারণ প্রার্থীদের জন্য নির্বাচন কঠিন হয়ে যেতে পারে।

তাই এমন একটি মধ্যমপন্থা খোঁজা হচ্ছে, যাতে—

অপ্রয়োজনীয় বা ডামি প্রার্থী কমে
আবার যোগ্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত না হয়
পোস্টার নিষিদ্ধ ও অনলাইন মনোনয়নসহ আরও পরিবর্তনের পরিকল্পনা

নির্বাচন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আরও কয়েকটি সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। এর মধ্যে রয়েছে—

পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিল
ইভিএম ব্যবহারের বিধান বাদ

এসব বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

কমিশনের বৈঠক ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া

ইসির আইন ও বিধি সংস্কার সংক্রান্ত কমিটির একটি বৈঠক বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালায় কী কী পরিবর্তন আনা হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

বৈঠকে জামানত বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। কমিটি সিদ্ধান্ত নিলে তা কমিশন সভায় উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের অনুমোদনের পরই চূড়ান্তভাবে বিধি সংশোধন কার্যকর হবে।

কমিটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে এবং জামানত সংক্রান্ত বিষয়েও সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে আসতে পারে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট

বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন চালুর সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চরিত্রে বড় পরিবর্তন আনবে। এর ফলে প্রার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জটিলতা—সবই নতুনভাবে বিবেচনায় নিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

এ পরিস্থিতিতে জামানত বৃদ্ধি ও প্রার্থী নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স