যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ইউরোপে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতিতে কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে রাশিয়া।
ব্রিটিশ দৈনিক The Telegraph–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা নির্ভরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত ভরসা এখন মহাদেশটির নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
টমাহক পরিকল্পনা থেকে সরে আসা
২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন ইউরোপে দূরপাল্লার ‘টমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম এসব ক্ষেপণাস্ত্র জার্মানিতে মোতায়েন হওয়ার কথা ছিল।
এই সিদ্ধান্তকে ইউরোপীয় নিরাপত্তা জোট NATO–এর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং নীতি পরিবর্তনের ফলে সেই পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যায়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জার্মানির সঙ্গে মতবিরোধের পর টমাহক সরবরাহ বাতিল করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোপের দুর্বলতা স্পষ্ট
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বড় সমস্যা হলো—রাশিয়ার ভেতরে থাকা কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু যেমন সাবমেরিন ঘাঁটি বা গভীর সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানার মতো ভূমি-ভিত্তিক দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি।
ইউরোপের কিছু সমুদ্রভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা থাকলেও স্থলভিত্তিক বিকল্প সীমিত। ফলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রকে অনেকেই ইউরোপীয় প্রতিরক্ষার জন্য ‘অপরিহার্য’ হিসেবে বিবেচনা করছিলেন।
এই ঘাটতির কারণে এখন জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোকে নতুন করে বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে।
জার্মানির তিনমুখী কৌশল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জার্মানি এখন তিনটি বিকল্প একসঙ্গে বিবেচনা করছে—যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পুনরায় সংগ্রহ, অন্য কোনো দেশ থেকে সমমানের অস্ত্র কেনা, এবং ইউরোপীয় যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন।
একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মানি চাইছে ইউক্রেনকে যুক্ত করে একটি অন্তর্বর্তী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ে তুলতে।
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস শিগগিরই ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সরাসরি টমাহক কেনার বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র–জার্মানি টানাপোড়েন
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বার্লিনের সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ফলে এই আলোচনায় বড় অগ্রগতি হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
প্রতি ইউনিট টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩৪ লাখ ডলার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া এসব অস্ত্র অন্য দেশে হস্তান্তর বা ব্যবহার করা যায় না, যা ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করে।
ইউরোপীয় নিজস্ব উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউরোপ ইতোমধ্যে ‘ইউরোপিয়ান লং-রেঞ্জ স্ট্রাইক অ্যাপ্রোচ’ (ELSA) নামের একটি যৌথ প্রকল্প শুরু করেছে। এতে ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য অংশ নিচ্ছে।
লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এই লক্ষ্য অর্জন সময়সাপেক্ষ হবে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের ভাষায়, ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে অন্তত কয়েক বছর সময় লাগবে, এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইউক্রেনের সহযোগিতা ছাড়া দ্রুত সমাধান কঠিন।
রাশিয়ার কৌশলগত সুবিধা
এই পরিস্থিতিতে সামরিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দীর্ঘপাল্লার পাল্টা সক্ষমতার ঘাটতি মস্কোর জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
রাশিয়ার আধুনিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ভারসাম্যকে আরও চাপের মধ্যে ফেলেছে।
আস্থার সংকট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপ সম্পর্কের এই টানাপোড়েন শুধু অস্ত্র সরবরাহের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘদিনের কৌশলগত আস্থার সংকটের প্রতিফলন।
একজন ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “এই সম্পর্ক আর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া কঠিন। পারস্পরিক আস্থা ক্ষয় হয়েছে।”
ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং ন্যাটোর ভেতরে নীতিগত বিভক্তি ইউরোপকে বাধ্য করছে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা