পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেছেন। ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসেই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং তা গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সরকার গঠনের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় তাঁর পদত্যাগকে ঘিরে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদত্যাগপত্র জমা দেন দীপেন দেওয়ান। পদত্যাগপত্রে তিনি শারীরিক অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর পদত্যাগের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান লিখেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। নিয়মিত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে সমস্যা হওয়ায় সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে স্বেচ্ছায় মন্ত্রী পদ থেকে অব্যাহতি নেওয়াকে তিনি প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন।
পদত্যাগের পরদিনই তাঁর অনুসারীরা রাঙামাটি শহরে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। তাঁরা দাবি করেন, চাপ প্রয়োগের কারণেই মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের দাবি জানান। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের একাংশও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তবে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, দীপেন দেওয়ান শারীরিকভাবে অসুস্থ নন বলেই তাঁদের ধারণা। অন্যদিকে তাঁর অনুসারীরা দাবি করছেন, রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
দিনভর আলোচনায় আরও উঠে আসে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক টানাপোড়েন, পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ। বিশেষ করে তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে মতভিন্নতা তৈরি হয়েছিল বলে একাধিক সূত্র দাবি করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হলো মন্ত্রণালয়ের কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পার্বত্য এলাকার বাইরে থেকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ নিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ ছিল বলে জানা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে।
তবে এসব বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের কোনো দূরত্ব নেই। তিনি বলেন, তাদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিকভাবে কোনো বিরোধ ছিল না। তিনি আরও জানান, পদত্যাগের খবর জানার পর তিনি যোগাযোগের চেষ্টা করলেও মন্ত্রীকে পাননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, জেলা পরিষদ পুনর্গঠন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ভারসাম্য নিয়ে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন থাকতে পারে। আবার অন্য সূত্র বলছে, সরকারিভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চাপ এবং মন্ত্রীর নিজস্ব অবস্থানের কারণে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল।
দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক জীবনে রয়েছে দীর্ঘ প্রশাসনিক ও দলীয় অভিজ্ঞতা। তিনি বিচার বিভাগে কর্মজীবন শুরু করে পরে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। দীর্ঘদিন রাঙামাটি জেলা বিএনপির নেতৃত্বে থাকার পর তিনি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন। নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ের পর তিনি প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।
পদত্যাগকে কেন্দ্র করে রাঙামাটিতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একটি অংশ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। বক্তারা দাবি করেন, তাঁর পদত্যাগ পাহাড়ের রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
বর্তমানে সরকারের মন্ত্রিসভায় নতুন করে পরিবর্তনের আলোচনা চলছিল বলেও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ সরকারের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সরকারি সূত্রগুলো অবশ্য এখনো পদত্যাগের প্রকৃত কারণ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ফলে ব্যক্তিগত অসুস্থতা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মতবিরোধ—সবকিছুই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।