বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী ও অংশীদার তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের বরাতে জানা গেছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। শেষ সময়গুলো তিনি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানেই কাটান।
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন প্রভাবশালী ছাত্রনেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবেও তিনি নেতৃত্ব দেন।
১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। ওই সময় ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজিত জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণার ঘটনাটিও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭০ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং মাত্র ২৭ বছর বয়সে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর পর তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে ‘মুজিব বাহিনী’র পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন প্রধান সংগঠক হিসেবে তিনি কাজ করেন।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের সময় তিনি যুব সংগঠন জাতীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ কারাবাসের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দলীয় জীবনে তিনি একাধিকবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তবে বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের পর রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়। ওই বছর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি প্রথমে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। এক-এগারোর সময় দলীয় রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা থেকে দূরে সরে যান। পরে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী ফোরাম থেকে বাদ পড়ার পর তাঁর প্রভাব অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। এরপরের বছরগুলোতে তিনি উপদেষ্টা পরিষদে থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা কমে যায়।
তবুও ২০১৩–২০১৮ সময়কালে তিনি আবারও মন্ত্রিসভায় ফিরে আসেন এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে পরবর্তী মন্ত্রিসভাগুলোতে তিনি আর স্থান পাননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসা প্রজন্মের অন্যতম প্রতীক। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান যেমন দ্রুত ছিল, তেমনি শেষ পর্যায়ে এসে দলীয় ক্ষমতা কাঠামোতে তাঁর অবস্থান অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে।
তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক যুগের অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতি এবং সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তাঁর দীর্ঘ অবদান, নেতৃত্বের উত্থান–পতন এবং শেষ সময়ে দলীয় কাঠামোর ভেতরে তাঁর অবস্থান।