জাতীয় সংসদে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দেশে ফেরার পর ব্যবসায়ী এস আলমের মালিকানাধীন বলে আলোচিত একটি গাড়িতে চড়ে সংবর্ধনা নেওয়ার ঘটনা। বুধবার সংসদে এক আলোচনার সময় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান বিষয়টি উত্থাপন করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন এবং বলেন, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কোনো ব্যক্তির গাড়িতে চড়ে সংবর্ধনা গ্রহণ করেননি।
একই দিনে সংসদে ইসলামী ব্যাংকের রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম (আরডিএস) প্রকল্পের অর্থ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগের দিনের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক হয়। জামায়াতের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মন্ত্রীর দেওয়া তথ্যকে ‘অসত্য’ দাবি করে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
সংসদে পুরোনো বিতর্কের পুনরুত্থান
বুধবার সংসদের আলোচনায় অংশ নিয়ে নজিবুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অতীতের একটি বিতর্কিত ঘটনাকে সামনে আনেন। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় মন্তব্য করেন যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘নুন খেয়ে’ কিছু করছেন।
নজিবুর রহমানের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথমেই তাঁর ‘সেন্স অব হিউমার’-এর প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে ঘটনাটি নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মন্ত্রী বলেন, “আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কোনো ব্যক্তির গাড়িতে চড়ে সংবর্ধনা গ্রহণ করিনি।”
কী ঘটেছিল কক্সবাজারে
সালাহউদ্দিন আহমদ ঘটনার পটভূমি তুলে ধরে বলেন, তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকার পর দেশে ফেরেন। সে সময় কক্সবাজারে তাঁকে স্বাগত জানাতে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সমর্থক উপস্থিত হয়েছিলেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর এলাকায় মানুষের ভিড় এত বেশি ছিল যে ব্যক্তিগত যানবাহনের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মন্ত্রী বলেন, “কক্সবাজারে যখন আমি গিয়েছি, লক্ষ লোকের সমাবেশ হয়েছিল। কোনো গাড়ি বিমানবন্দরে ঢোকার সুযোগ পায়নি। অনেক মাইক্রোবাস ছিল। একটাতে উঠলাম, সেখানে জায়গা হলো না। পরে আরেকটিতে উঠলাম। এরপর সমর্থকেরা আমাকে আরও একটি গাড়িতে তুলে দেয়।”
তিনি দাবি করেন, ওই সময় গাড়িটির মালিকানা বা পরিচয় সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না।
‘পরে জানতে পেরেছি’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরবর্তীকালে তিনি জানতে পারেন যে যে গাড়িটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটি বহু পুরোনো একটি গাড়ি এবং সেটিকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তার যথেষ্ট বাস্তবভিত্তি ছিল না।
তিনি বলেন, “সেটা কোনো ব্যক্তির নামে গাড়ি না। ১৭-১৮ বছর আগের একটি গাড়ি। তারপরও যদি সেটা ভুল হয়ে থাকে, আমি জাতির সামনে দুঃখ প্রকাশ করেছি। বিষয়টি তখনই পরিষ্কার হয়ে গেছে। এটা একটা পুরোনো ইস্যু।”
মন্ত্রী মনে করেন, বিষয়টি অতীতে ব্যাখ্যা ও নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার পরও অপ্রয়োজনীয়ভাবে আবার সংসদে টেনে আনা হয়েছে।
‘খুব একটা গরিব না’
বক্তব্যের একপর্যায়ে নিজের আর্থিক সামর্থ্যের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমার চারটি গাড়ি আছে, আমার চারজন ড্রাইভার আছে। খুব একটা গরিব না।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন যে অন্যের গাড়ির ওপর নির্ভর করার মতো পরিস্থিতি তাঁর ছিল না।
বক্তব্য বাদ দেওয়ার অনুরোধ
নজিবুর রহমানের উত্থাপিত মন্তব্যকে আপত্তিকর আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, ঘটনাটি অনেক আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং পুরোনো একটি বিষয় নতুন করে সংসদে আনা হয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট মন্তব্য কার্যবিবরণীতে রাখার প্রয়োজন নেই।
জবাবে স্পিকার জানান, বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। সংসদীয় বিধি অনুযায়ী যদি কোনো বক্তব্য অসংসদীয় বলে বিবেচিত হয়, তাহলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে।
ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস নিয়ে নতুন বিতর্ক
একই অধিবেশনে ইসলামী ব্যাংকের রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম (আরডিএস) প্রকল্পের অর্থ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগের দিনের বক্তব্যও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
মঙ্গলবার সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, আরডিএস প্রকল্পের অর্থ একটি রাজনৈতিক দলের কাছে গেছে। বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে দুই দফায় মোট ২২ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বুধবার পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান জামায়াতের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান।
‘তথ্য অসত্য’
নজিবুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংক একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি এবং প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক হিসাব প্রতিবছর নিরীক্ষা (অডিট) করা হয়।
তিনি দাবি করেন, অডিট রিপোর্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উল্লেখ করা পরিমাণ অর্থের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না।
সংসদে তিনি বলেন, “অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৪ সালে আরডিএস প্রকল্পে মোট ৬ হাজার ৭১২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং ২০২৫ সালে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। ১১ হাজার ও ১১ হাজার মিলিয়ে ২২ হাজার কোটি টাকার তথ্য তিনি কোথা থেকে পেলেন, আমি জানি না।”
নজিবুর রহমানের মতে, সংসদে উপস্থাপিত তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তা সংসদের রেকর্ডে থাকা উচিত নয়।
কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি
জামায়াতের এই সংসদ সদস্য দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগের দিনের বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ বা বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
তিনি স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অডিট রিপোর্টও তিনি জমা দিতে প্রস্তুত আছেন।
স্পিকারের পর্যবেক্ষণ
জবাবে স্পিকার সংসদীয় বিধির বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, পয়েন্ট অব অর্ডার সাধারণত চলমান বা তাৎক্ষণিক কোনো বিষয়ে উত্থাপন করতে হয়। আগের দিনের আলোচিত বিষয় নতুন করে পয়েন্ট অব অর্ডারের আওতায় আনা যায় না।
স্পিকার বলেন, “মাননীয় সদস্য, পয়েন্ট অব অর্ডার বর্তমান বা চলমান বিষয়ের ওপর উত্থাপন করতে হয়। বিষয়টি গতকালই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আজ আর এটি বৈধ নয়।”
তবে তিনি নজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়ার পরামর্শ দেন এবং জানান, বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে।
সংসদে রাজনৈতিক উত্তাপ
বুধবারের অধিবেশনে দুটি পৃথক প্রসঙ্গ—একদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বহুল আলোচিত গাড়ি–বিতর্ক এবং অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পের অর্থ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য—সংসদে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি করে। একদিকে মন্ত্রী অতীতের বিতর্কের ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টিকে নিষ্পত্তি হওয়া অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে জামায়াতের সংসদ সদস্য তাঁর বক্তব্যের তথ্যগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ফলে সংসদের কার্যবিবরণী, বক্তব্যের সত্যতা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা—এই তিনটি বিষয়ই বুধবারের আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।