যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের মোট ২২টি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে তাদের ভূখণ্ডে কথিত ‘হামলা, হত্যাচেষ্টা, অপহরণ ও হয়রানি’ বন্ধ করার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করেছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে দেশগুলো বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হচ্ছে’—যৌথ অবস্থান
বিবৃতিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভূখণ্ডে ব্যক্তিদের হত্যা, অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি বা অন্য যেকোনো ধরনের আক্রমণের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
তারা আরও উল্লেখ করে, এসব কর্মকাণ্ড শুধু আন্তর্জাতিক নিয়মই নয়, সংশ্লিষ্ট দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকেও সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।
ইরানের গোয়েন্দা ও কুদস ফোর্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ
যৌথ বিবৃতিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর গোয়েন্দা ইউনিট এবং এর বিদেশে অভিযান পরিচালনাকারী শাখা কুদস ফোর্সকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব সংস্থা ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক, এবং ইহুদি ও ইসরায়েলি সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে “প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্র ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে” জড়িত।
দেশগুলো দাবি করে, এসব কার্যক্রম বহু দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করছে এবং ভিন্নমত দমনে আন্তর্জাতিক সীমা অতিক্রম করছে।
‘ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা অবস্থান’ ঘোষণা
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো জানায়, তারা নিজেদের নাগরিক ও ভূখণ্ডকে এসব হুমকি থেকে রক্ষা করতে একযোগে কাজ করবে।
তাদের ভাষায়, “এসব হুমকির বিরুদ্ধে আমাদের দেশ ও জনগণকে রক্ষা করার সংকল্পে আমরা ঐক্যবদ্ধ।”
একই সঙ্গে ইরানকে অবিলম্বে এসব কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়।
ইউরোপে হামলা-অভিযানের অভিযোগ
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, ইউরোপজুড়ে ইহুদি সম্প্রদায়, ইরানি নির্বাসিত ব্যক্তি এবং সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে, যার পেছনে ইরান-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের ভূমিকা রয়েছে।
এছাড়া একটি ইরান-সম্পৃক্ত গোষ্ঠী—হারাকাত আশাব আল-ইয়ামিন আল-ইসলামিয়া—এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার আগের অবস্থান ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ
বিবৃতির প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপও উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে।
গত বছরের আগস্টে অস্ট্রেলিয়া তেহরানে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে। ক্যানবেরা অভিযোগ করে, ইরান তাদের দেশে অন্তত দুটি ইহুদিবিদ্বেষী হামলার নির্দেশ দিয়েছিল।
এরপর অস্ট্রেলিয়া তেহরান থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে এবং দূতাবাস কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে।
পরবর্তীতে গত নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে ঘোষণা করে।
স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর তালিকা
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে মোট ২২টি দেশ। এগুলো হলো—
আলবেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, বুলগেরিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, উত্তর মেসিডোনিয়া, নরওয়ে, পর্তুগাল, সুইডেন এবং যুক্তরাষ্ট্র।
পর্যবেক্ষণ
২২ দেশের এই যৌথ অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ইরানকে ঘিরে নতুন চাপ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সমন্বিত অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রম নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।