দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন প্রণোদনা কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, কেউ বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সক্ষম হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ওই বিনিয়োগের ওপর ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা (কমিশন/পরামর্শক ফি) দেওয়া হবে।
বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে একাধিক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরুতেই এই প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
বিদেশি বিনিয়োগে নতুন প্রণোদনা নীতি
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য জহরত আদীব চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা ছিল মুনাফা প্রত্যাবর্তন বা লভ্যাংশ নিয়ে জটিলতা। সরকারের উদ্যোগে সেই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আগে একটি বিষয় ছিল—লভ্যাংশ দেশে নিতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন এখানে আসবে। আমরা সেই সমস্যার আইনগতভাবে সমাধান করেছি।”
এরপর তিনি জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, কোনো বাংলাদেশি বা বিদেশি ব্যক্তি যদি দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে পারেন, তাহলে তাকে বিনিয়োগের ওপর ১.৫ শতাংশ পরামর্শক ফি বা প্রণোদনা দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রণোদনার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও দেশে বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে উৎসাহিত হবেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দক্ষ ব্যক্তি ও পেশাজীবীরা ভূমিকা রাখতে পারবেন।
বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণে সরকারের পদক্ষেপ
বিএনপির সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
তিনি জানান, আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে এখন আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনলাইনে দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে, যাতে সময় ও জটিলতা কমে আসে।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে—
রপ্তানি নীতি হালনাগাদ করা হয়েছে
আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯ হালনাগাদের কাজ চলছে
অশুল্ক বাধা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
আমদানি সহজীকরণের জন্য মূল্য পরিশোধ পদ্ধতি সহজ করা হচ্ছে
এলসি ছাড়াও চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ রাখা হচ্ছে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব পদক্ষেপের পূর্ণ সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ধাপে ধাপে অগ্রগতি
সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন।
তিনি বলেন, অর্থনীতি এক দিনে পরিবর্তন হয় না এবং অতীতের নীতিগত ভুলের প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতিতে থেকে যায়।
তার ভাষায়, “খারাপ নীতির প্রভাব যেমন ধীরে ধীরে আমাদের কাঁধে এসেছে, তেমনি বর্তমান সরকারের নেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপের সুফল পেতেও সময় লাগবে।”
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। সমস্যাগ্রস্ত কিন্তু সক্ষম শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এই তহবিল থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
সম–উন্নয়ন নীতি: সরকারদলীয় ও বিরোধী এমপিদের সমান সুযোগ
বিএনপির সংসদ সদস্য আনিসুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন বরাদ্দ বিতরণে কোনো ধরনের বৈষম্য রাখা হচ্ছে না।
তিনি জানান, কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নিয়ে একটি অভিযোগ আসে, যেখানে কিছু বিরোধী এমপি বরাদ্দ পাননি বলে জানানো হয়।
তিনি বলেন, “বৈঠক শেষে আমি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছি, যেন বিরোধীদলীয় কোনো সদস্য বরাদ্দ না পেয়ে থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার উন্নয়নে সমতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সরকারদলীয় ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সমান সহযোগিতা দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তারেক রহমান বলেন, গঠনমূলক সমালোচনা সরকার গ্রহণ করবে এবং তা উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করবে।
নারী সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান ও সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতেই নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়।
তিনি বলেন, “নারী সংসদ সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট আসন সংবিধানগতভাবে সীমাবদ্ধ না হলেও রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে তাঁদের কাজের ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়।”
তিনি আরও জানান, নারী সংসদ সদস্যদেরও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে সমান অধিকার রয়েছে এবং সরকার তাঁদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
সামাজিক কর্মসূচি ও উন্নয়ন উদ্যোগ
বিএনপির সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী চলমান সামাজিক ও উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরেন।
তিনি জানান—
৬০,০৪৪টি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে (পাইলট পর্যায়ে)
২০,৭৪৮ জন কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হয়েছে
কৃষি খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে
৪,৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির, ১৪৪টি বৌদ্ধবিহার/প্যাগোডা ও ৩৯৬টি গির্জার কর্মীদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে
আসন্ন মৌসুমে প্রায় ৩ কোটি ১৪ লাখ চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ লাখ শিশুর জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে
পর্যবেক্ষণ
বুধবারের সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থনৈতিক নীতি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রশাসনিক সহজীকরণ এবং সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির বিস্তৃত রূপরেখা উঠে আসে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে ১.৫ শতাংশ প্রণোদনার ঘোষণা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, ব্যাংকিং সহায়তা ও উন্নয়ন বরাদ্দে সমতা নীতি সরকারের চলমান অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।