মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। গত শুক্রবার পবিত্র মক্কা নগরীতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই ঘোষণা সামনে আসার পরই প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি ন্যাটোর আদলে একটি নতুন মুসলিম সামরিক জোটের সূচনা? নাকি এটি আপাতত তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার একটি কাঠামো, যার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিধি এখনো স্পষ্ট নয়?
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো আক্রান্ত সদস্যকে রক্ষায় অন্য দুই দেশ বাধ্যতামূলকভাবে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেবে—চুক্তিতে এমন সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে চুক্তিটিকে সরাসরি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে।
কেন এই চুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ
চুক্তিটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ও তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়েছে, মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার উপস্থিতি থাকলেও আঞ্চলিক হুমকি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
সৌদি আরবভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগেরের মতে, নতুন ত্রিপক্ষীয় কাঠামো তিন দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি অঞ্চলভিত্তিক নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চুক্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব যতটা, সামরিক বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিষয়টি ততটাই জটিল।
তিন দেশের তিন ধরনের শক্তি
নতুন এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিন অংশীদারের শক্তির ধরন এক নয়; বরং একে অন্যের পরিপূরক।
পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র মুসলিম-অধ্যুষিত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। দেশটির রয়েছে বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল আর্থিক সম্পদ এবং আধুনিক মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং দেশটির সামরিক বাহিনী জোটটির অন্যতম বৃহৎ বাহিনী। পাশাপাশি গত এক দশকে তুরস্ক নিজস্ব ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে।
অর্থাৎ তিন দেশের সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি—এই সমন্বয়ই চুক্তিটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
তবে সক্ষমতা থাকা আর একটি কার্যকর সামরিক জোট পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক অগ্রাধিকার এবং বৈদেশিক নীতির হিসাব এই জোটের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতায় বড় ভূমিকা রাখবে।
‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা কি এখনই ঠিক?
চুক্তি স্বাক্ষরের পর সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো ‘ইসলামিক ন্যাটো’। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকে এ ধরনের তুলনাকে এখনই অতিরঞ্জিত মনে করছেন।
নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ মুদাসসির কামার মনে করেন, চুক্তিটিকে এখনই একটি নতুন নিরাপত্তা ব্লক বা সামরিক মেরুকরণের সূচনা হিসেবে দেখার পর্যায়ে যাওয়া ঠিক হবে না।
এর একটি কারণ, মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে এর আগেও সামরিক সহযোগিতা বা যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর সবগুলো দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সামরিক জোটে পরিণত হয়নি।
ফলে মক্কা চুক্তির প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে ভবিষ্যতে তিন দেশ কতটা যৌথ সামরিক পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অস্ত্র ও প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যেতে পারে তার ওপর।
চুক্তির পেছনে কয়েক মাসের সমঝোতা
নতুন এই চুক্তি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। কয়েক মাস ধরে তিন দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে গত বছর স্বাক্ষরিত একই ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের ওপর।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বিস্তৃত হয়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে তুরস্কের তৈরি ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি বাস্তব ভিত্তিও আগে থেকেই তৈরি ছিল।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা হিসাব
রিয়াদের জন্য চুক্তিটির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি দেখা যেতে পারে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির আলোকে।
সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা হলেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। একই সময়ে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সংঘাত নতুন করে উপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সৌদি আরব তাই একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে অন্যদিকে বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদারও তৈরি করতে চাইছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক এই ক্ষেত্রে রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি অংশীদার হতে পারে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা সৌদি আরবের নিরাপত্তা হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতীকী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিমধ্যে পাকিস্তানের কয়েক হাজার সেনা, ১৬টি যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং চীনে তৈরি একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থান করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন চুক্তির আগে থেকেই সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি বাস্তব সামরিক ভিত্তি ছিল।
তুরস্ক কেন আগ্রহী
তুরস্কের হিসাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুরস্ক গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ায় নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের দ্রুত বিকাশ এ প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
একই সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়েও আঙ্কারার উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই সংবেদনশীল। ফলে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তুরস্ককে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করার সুযোগ দিতে পারে।
পাকিস্তানের জন্যও বড় সুযোগ
ইসলামাবাদের জন্য চুক্তিটি একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকা পাকিস্তান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও কৌশলগতভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরব পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। অন্যদিকে তুরস্কের সঙ্গে ইসলামাবাদের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কও গভীর।
এই দুই দেশের সঙ্গে একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়া পাকিস্তানের আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
এ ছাড়া মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে নিজের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ানোর সুযোগও পেতে পারে ইসলামাবাদ।
ইরানের আপত্তি
তবে নতুন এই চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট উদ্বেগ এসেছে প্রতিবেশী ইরান থেকে।
ইরানের পার্লামেন্ট এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে চুক্তিটিকে ‘কাগজের চুক্তি’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সৌদি আরবের নিরাপত্তা কেবল তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হবে না।
ইরানের উদ্বেগের পেছনে শুধু সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্ক নয়, তুরস্কের সঙ্গে ইরানের জটিল আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাও কাজ করছে। ফলে মক্কা চুক্তি যদি ভবিষ্যতে একটি কার্যকর সামরিক কাঠামোয় রূপ নেয়, তাহলে তেহরান সেটিকে নিজের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
ভারতের নজরও তীক্ষ্ণ
চুক্তিটির দিকে ঘনিষ্ঠভাবে তাকিয়ে আছে ভারতও। এর প্রধান কারণ পাকিস্তান।
পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বৈরিতা রয়েছে। আবার তুরস্কও বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের প্রতি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন জানিয়েছে। ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে এই দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারতের জন্য নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি বিষয়টি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ মুদাসসির কামারের মতে, এই চুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন বার্তা
মক্কা চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর রাজনৈতিক বার্তা।
সৌদি আরব ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরব মিত্র। উপসাগরীয় নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে রিয়াদের নিরাপত্তা নীতির অন্যতম ভিত্তি।
কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে সৌদি আরব যদি যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলে, তাহলে সেটি ওয়াশিংটনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার পরিবর্তে বহুমুখী নিরাপত্তা কৌশলের ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে দিচ্ছে। বরং রিয়াদ একই সঙ্গে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত বিকল্প বাড়ানোর চেষ্টা করছে—এমন ব্যাখ্যাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
সামনে বড় প্রশ্ন
মক্কা চুক্তি তাই নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিকে এখনই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ ঘোষণা করা সম্ভবত সময়ের আগে হয়ে যাবে।
চুক্তিটি কার্যকর সামরিক জোটে রূপ নিতে হলে তিন দেশের মধ্যে আরও অনেক বিষয়ে সমঝোতা প্রয়োজন। যৌথ সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতা, সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ এবং আক্রান্ত সদস্যকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বাস্তব কাঠামো—এসব বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেটিই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তিন দেশের কেউ আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ বাস্তবে কতটা সামরিক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকবে।
সুতরাং মক্কা চুক্তিকে আপাতত একটি উচ্চাভিলাষী ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি যদি সময়ের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে এর প্রভাব গভীর হতে পারে। আর যদি চুক্তি কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা ও সীমিত সামরিক সহযোগিতার মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে এর পরিচিতি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। মক্কার এই চুক্তি সেই পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।